ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজিতে মালিকপক্ষ জড়িত

** ফাইন ফুডসের পরিচালক মো. সালাউদ্দিন হায়দার কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করেছেন
** বিএসইসি এ কারসাজির জন্য মো. সালাউদ্দিন হায়দার কে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে
** সিটি ব্যাংকও এ কারসাজির সাথে জড়িত
** কারসাজির জন্য কৃত্রিম আর্থিক হিসাব দেখায় কোম্পানিটি

পুঁজিবাজারে শেয়ার কারসাজির আলোচিত কোম্পানি ফাইন ফুডস। ব্যবসায়িক পারফরমেন্স ভালো না হলেও শেয়ার দর আকাশ চুম্বি। এবার এ কোম্পানির মালিকপক্ষকে শেয়ার করসাজির দায়ে জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। শুধু মালিকপক্ষই নয় এ কোম্পানির শেয়ার কারসাজি করে ফেসেছে সিটি ব্যাংকও। পাশাপাশি এ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ শেয়ার দর নিয়ে কারসাজির জন্য কৃত্রিম আর্থিক হিসাব দেখিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে ব্যয় কমিয়ে মুনাফা বেশি ও সম্পদ বেশি দেখিয়ে আসছে, যা কোম্পানির নিরীক্ষকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে ২০২৪ এবং ২০২৫ অর্থবছরের ফাইন ফুডসের আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষক তার মতামেত এসব তথ্য তুলে ধরেছেন।

ফাইন ফুডস লিমিটেডের শেয়ার নিয়ে কারসাজির দায়ে পাঁচ ব্যক্তি ও দুই প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ বছরের জানুয়ারিতে বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে। আদেশ জারি হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে জরিমানা অর্থ বিএসইসির অনুকূলে জমা দিতে বলা হয়েছে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ফাইন ফুডসের শেয়ার লেনদেন-সংক্রান্ত বিষয়ে একটি তদন্ত করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর ফাইন ফুডসের শেয়ারের সমাপনী দর ছিল ১৫৫ টাকা ৮০ পয়সা। একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর শেয়ারটির দর বেড়ে ২১৮ টাকা ৬০ পয়সায় দাঁড়ায়। ডিএসইর তদন্তে কোম্পানিটির শেয়ারদর নিয়ে কারসাজির বিষয়টি উঠে আসে। ডিএসইর পক্ষ থেকে তদন্ত শেষে বিএসইসির কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শুনানি শেষে শেয়ার কারসাজিতে জড়িত থাকার দায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা করেছে কমিশন।

ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজির দায়ে যে পাঁচ ব্যক্তিকে জরিমানা করা হয়েছে, তার মধ্যে অভিজিত দাশকে ৫৮ লাখ টাকা, মো. সানোয়ার খানকে ২৫ লাখ, আসমাউল হুসনাকে ৯ লাখ, মো. আনোয়ার পারভেজ খানকে ২ লাখ ও ফাইন ফুডসের পরিচালক মো. সালাউদ্দিন হায়দারকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে মো. সালাউদ্দিন হায়দার কোম্পানিটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। মো. সানোয়ার খান সিটি ব্যাংক পিএলসির পুঁজিবাজার বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন। মো. সানোয়ার খানের স্ত্রী আসমাউল হুসনা ও ভাই মো. আনেয়ার পারভেজ খান। পাশাপাশি এ কারসাজির ঘটনায় এসএসএস হোল্ডিংস লিমিটেডকে (মো. সানোয়ার খানের প্রতিষ্ঠান) ১৭ লাখ ও সিটি ব্যাংককে ৪২ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বিএসইসি।

বিএসইসি জানিয়েছে, নথিপত্র বিশ্লেষণ করার পর দেখা গেছে যে, ফাইন ফুডস লিমিটেডের পরিচালক (এনএলআই সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ক্লায়েন্ট কোড # ০৩৩২২) মো. সালাউদ্দিন হায়দার ২৮-১০-২০২৪ থেকে ২৪-১২-২০২৪ পর্যন্ত ফাইন ফুডস শেয়ার লেনদেনের সাথে জড়িত ছিলেন। এ সময় সালাউদ্দিন হায়দার ফাইন ফুডস লিমিটেডের পরিচালক ছিলেন এবং এক্সচেঞ্জের কাছে কোনও ক্রয়-বিক্রয় ঘোষণা প্রদান করেননি। ডিএসই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রচারিত ডিএসই সংবাদ অনুসারে, ফাইন ফুডস লিমিটেডের পরিচালক মো. সালাউদ্দিন হায়দারের পক্ষে কোনও ক্রয়-বিক্রয় ঘোষণা পাওয়া যায়নি। এর মাধ্যমে তিনি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (তালিকাভুক্তি) প্রবিধান, ২০১৫ এর ধারা ৩৪ (১) লংঘন করেছেন।

এবারই প্রথমবার নয় এর আগেও ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজি করার দায়ে বিভিন্ন ব্যাক্তি প্রতিষ্ঠানকে বিএসইসি জরিমানা করেছিল। এর আগে ২০২৫ সালে জানুয়ারি মাসে ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজির কারনে ৪ ব্যাক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার কথা জানায় বিএসইসি।

শেয়ার কারসাজির সময়কাল

২০২৩ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে কোম্পানির শেয়ারের দাম কারসাজি করে বাড়িয়ে তোলা হয়। পরে সুবিধামতো সময়ে শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা হাতিয়ে নেয় কারসাজি চক্র। ২০২৩ সালের ১ মার্চ ফাইন ফুডসের শেয়ারের দাম ছিল ৬০.৯০ টাকা। আর ২৫ জুন কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ টাকায়। ফলে প্রায় চার মাসের ব্যবধানে কোম্পানির শেয়ারের দাম কারসাজির মাধ্যমে বেড়ে দাঁড়ায় ৬২.১০ টাকা বা ১০১.৯৭ শতাংশ।

বিএসইসির জরিমানার সিদ্ধান্ত

২০২৩ সালের ২ মার্চ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ফাইন ফুডের শেয়ার কারসাজি করে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর সেকশন ১৭(ই)(২) ও সেকশন ১৭(ই)(৫) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শেয়ার অর্জন, অধিগ্রহণ ও কর্তৃত্ব গ্রহণ) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৪(১) ভঙের দায়ে মোহাম্মদ শামসুল আলমকে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং তার সহযোগী সাজিয়া জেসমিনকে ৪৯ লাখ টাকা, সুলতানা পারভিনকে ১১ লাখ টাকা, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে ১ লাখ টাকা, এএএ এগ্রো এন্টারপ্রাইজকে ৭৫ লাখ টাকা এবং আরবিম টেকহো লিমিটেডকে ২৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিস্থিতি

ফাইন ফুডস লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০০২ সালে। ‘বি’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সে হিসাবে কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৩৯ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৮টি। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ১৩.৯২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২৪ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৬২. ০৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।