আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়্যারম্যান তারেক রহমানের। ২১ সেপ্টেম্বর তার নিউইয়র্কে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সফরকালে তিনি জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন এবং তার সম্মানে একটি নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোতে দুদিনের একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পর দেশে ফেরার কথা রয়েছে তার। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক হলে এই যুক্তরাষ্ট্র সফর ৮ থেকে ১০ দিনের হতে পারে বলে সরকার ও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ফলে দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর জাতিসংঘ সদর দপ্তরের মিলনায়তনে একই সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ও সভাপতির আসন যেন সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল এক কূটনৈতিক দৃশ্যপট প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। সরকারপ্রধানের সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সফরসূচি ও অন্যান্য কর্মসূচি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বলে জানা গেছে।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন। এবার তার সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে নিউইয়র্কে বৃহৎ নাগরিক সংবর্ধনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় নেতারা অনলাইনে ভার্চুয়াল প্রস্তুতি সভা করেছেন। দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী তাকে স্বাগত জানাতে নিউইয়র্কে সমবেত হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সফরসূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি এবং তা নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে।
উল্লেখ্য যে, সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গত ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া এবং চীন সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার ওই দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানি, পণ্য আমদানি-রপ্তানি, করিডোর স্থাপনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমওইউ এবং চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এরপর কয়েকটি দেশ সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের আগে প্রধানমন্ত্রী আপাতত অন্য কোনো দেশ সফরে যাচ্ছেন না বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের সময়সূচি ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি প্রসঙ্গে কূটনৈতিক ও দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আগামী ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর বহর নিউইয়র্কে পৌঁছানোর সম্ভাব্য সূচি নির্ধারিত রয়েছে। অধিবেশনে যোগদানের পাশাপাশি তিনি সফরকালে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিতে পারেন। পরে ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের মূল মিলনায়তনে তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে তার বহুল প্রতীক্ষিত ঐতিহাসিক ভাষণ তুলে ধরবেন।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভাষণকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে একটি অভূতপূর্ব দৃশ্যপট তৈরি হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন প্রধান পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের নতুন পথচলা, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতি, টেকসই উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সংকট সমাধানে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন—তখন জাতিসংঘ অধিবেশনের সভাপতির আসনে বসে সেই সভা পরিচালনা করবেন বাংলাদেশেরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে একই দেশের সরকারপ্রধান মূল মঞ্চে ভাষণে আর তারই ক্যাবিনেটের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বসভার সর্বোচ্চ আসনে থেকে সেই অধিবেশন নিয়ন্ত্রণ করছেন—এমন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমীকরণ আধুনিক বিশ্ব কূটনীতিতে অত্যন্ত বিরল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও শাসনব্যবস্থার ভিন্নতা জাতিসংঘে বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রসঙ্গ এলে অনেকেই ১৯৮৬ সালের কথা স্মরণ করেন। ওই বছর বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতিত্বের গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সে সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওই সময় বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা বজায় ছিল এবং তৎকালীন শাসন কাঠামোতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থান ও বিশ্বমঞ্চের সমীকরণটি ভিন্ন ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের পাঁচ দশকের ইতিহাসে প্রথমবার সংসদীয় গণতন্ত্রের অধীনে একই মন্ত্রিসভার শীর্ষ দুই প্রতিনিধি— প্রধান নির্বাহী হিসেবে ‘প্রধানমন্ত্রী’ এবং শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী’—একই সময়ে বিশ্বমঞ্চের ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ দুই দশক পর তারেক রহমানের নিউইয়র্ক গমন যেমন বিএনপির জন্য রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের প্রতীক, তেমনি জাতিসংঘের মতো মূল বৈশ্বিক মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ এবং বাংলাদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্ব একই সঙ্গে ঘটা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করবে। ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশের এ ঐতিহাসিক ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক উপস্থিতি বিশ্বদরবারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী এবং সভাপতি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যৌথ উপস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত গৌরবময় ও মর্যাদাপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, জাতিসংঘের এই ৮১তম অধিবেশন বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিএনপি সরকার গঠনের পর এটা বিরাট সাফল্য।
