আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৭) থেকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অভিভাবকদের উদ্বেগ, শিক্ষাবিদদের সমালোচনা এবং কোচিংনির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে আগের মতো লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে বা আনুষ্ঠানিকতার ভিত্তিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি এখনো বিবেচনায় রয়েছে। ওই কর্মকর্তা জানান, প্রথম শ্রেণিতে কোনো পরীক্ষা হবে না; লটারির মাধ্যমেই ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। অন্যান্য শ্রেণির ভর্তি পদ্ধতি নিয়ে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েও পেছাল সরকার
গত ১৬ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারিভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি বাতিল করে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। একই দিনে মন্ত্রণালয়ের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতেও জানানো হয়, সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ভর্তি পদ্ধতি চালু করা হবে এবং বিদ্যমান লটারির ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হবে। ওই সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সব শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এটি জটিল কোনো পরীক্ষা হবে না; বরং একটি সহজ ও সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমেই ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
কেন চালু হয়েছিল লটারি
এক সময় দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হতো। তবে অল্প বয়সে শিশুদের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ, কোচিংনির্ভরতা বৃদ্ধি, প্রশ্ন ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ, পাশাপাশি ভর্তিকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতির নানা অভিযোগ ওঠায় ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরে একই পদ্ধতি বেসরকারি বিদ্যালয়েও চালু হয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২১ শিক্ষাবর্ষে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণিতেই লটারিভিত্তিক ভর্তি কার্যক্রম শুরু করা হয়। এরপর থেকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিদ্যালয়ে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়ে আসছিল।
শিশুদের ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষাবিদদের আপত্তি
প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা চালুর ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ এর বিরোধিতা করেন। তাদের মতে, এত অল্প বয়সে পরীক্ষার মুখোমুখি করা শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর এবং এটি সামাজিক বৈষম্যও বাড়াবে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। যে ধরনের পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাতে যারা কোচিং বা প্রাইভেট পড়ে তারাই এগিয়ে থাকে। আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুরা এতে বঞ্চিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনের মতে, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনোভাবেই ভর্তি পরীক্ষা চালু করা উচিত নয়। তিনি বলেন, এ ধরনের পরীক্ষা চালু হলে কোচিং বাণিজ্য আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এবং এত অল্প বয়সে পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুদের মেধা মূল্যায়নও সঠিক নয়। পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে তা শিশুদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং তাদের মানসিকভাবে আঘাত করতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে, প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি চালু রাখার নীতিগত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে অভিভাবক ঐক্য ফোরাম। একই সঙ্গে সংগঠনটি প্রাথমিক স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণিতে লটারিভিত্তিক ভর্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু এবং সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম মিয়া সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানান।
একাদশে ভর্তি এসএসসির ফলের ভিত্তিতেই
এবারও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের কোনো ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে না। আগের বছরের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ভর্তি সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হবে এবং শিক্ষার্থীদের মেধা, পছন্দক্রম ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কোটা বিবেচনায় কলেজ নির্ধারণ করা হবে। সরকার পরিবর্তনের পর ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান পদ্ধতিই বহাল রাখার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের নিয়মেই ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের দু-এক দিনের মধ্যেই একাদশ শ্রেণির ভর্তি-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ও সময়সূচি ঘোষণা করা হবে।
