আলোচিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান ‘এসবিকে টেক ভেঞ্চারস লিমিটেড’-এর সিইও সোনিয়া বশির কবিরের বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশের একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত ৮০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বিনিয়োগ ও শেয়ার বিক্রির প্রলোভনে টাকা নিয়ে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। ভুক্তভোগীরা দেশে ও বিদেশে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছেন, যার কিছু তদন্ত চলছে, আর কিছু মামলায় পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে।
গত জানুয়ারিতে মিসেস জেরিন চৌধুরী ও তানভীর ইসলাম নামে দুজন ব্যবসায়ী সোনিয়া কবিরের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে চারটি মামলা করেন। মামলায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন তাঁরা। এর মধ্যে দুটি মামলা এনআই অ্যাক্টে করা। এসব মামলায় সোনিয়া কবিরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।
জেরিন চৌধুরী ১২ জানুয়ারি আদালতে করা একটি মামলায় অভিযোগ করেছেন, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সোনিয়া কবির হিসাব প্লাস ডটকম লিমিটেড এবং এসবিকে টেক ভেঞ্চারস লিমিটেডের শেয়ার বিক্রি, কোম্পানিতে বিনিয়োগ এবং লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার কাছ থেকে মোট ২ কোটি ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৩০০ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ২০২১ সালের ৬ জুলাই এক্সিম ব্যাংকের মাধ্যমে ১৬ লাখ ৫০ হাজার, ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর আইএফআইসি ব্যাংকের মাধ্যমে ৪০ লাখ, এবং একই বছরের ৫ জুন ৪৫ লাখ টাকা প্রদান করেছেন জেরিন চৌধুরী। এছাড়া হিসাব প্লাস ডটকম লিমিটেডে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন তিনি। এইভাবে কয়েক দফায় দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি ও লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে জেরিন চৌধুরীর কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন সোনিয়া কবির। জেরিন চৌধুরীর দাবি, সোনিয়ার কাছে এখনও মূলধন ও লভ্যাংশসহ ২ কোটি ৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকা বাকি আছে।
জেরিন চৌধুরীর করা মামলাটি ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পুলিশের বিশেষ তদন্ত সংস্থা পিবিআই তদন্ত করেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক এস এম আশরাফুল আলম ১৬ সেপ্টেম্বর আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়ে সোনিয়া কবিরকে দায়ী করেছেন। প্রতিবেদনে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে সোনিয়া কবিরের কাছে অর্থপ্রদান হওয়া প্রমাণিত হওয়া উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সোনিয়া কবিরকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্রও দাখিল করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফুল আলম জানান, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সোনিয়া কবির টাকা নিয়েছেন এবং তার সত্যতা মিলেছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
সোনিয়া কবির আরও কয়েকজন উদ্যোক্তার কাছ থেকে তার প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের কথা বলে টাকা নিয়েছেন। কাউকে কোম্পানির শেয়ার দেওয়ার কথা বলেছেন, আবার কাউকে লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলে বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাঁদের মধ্যে তানভীর ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী রয়েছেন। তানভীর ইসলামও গত জানুয়ারিতে ঢাকার নিম্ন আদালতে একটি মামলা করেছেন। মামলায় তিনি সোনিয়া কবিরকে ঋণ বাবদ এবং তাঁর কোম্পানিতে বিনিয়োগের জন্য ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন।
তানভীর ইসলামের মামলাটি তদন্ত করেছেন পিবিআইর পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মামলায় সোনিয়া কবিরের প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মামলার বাদী তানভীর ইসলাম বলেন, বিনিয়োগের কথা বলে টাকা নিয়ে সোনিয়া কবির মূলধন বা লভ্যাংশ কোনো কিছুই ফেরত দেননি। উল্টো তিনি ভয়ভীতি দেখাতেন, পারলে টাকা ফেরত নিয়ো—এমন হুমকি দিতেন।
এসবিকে টেক ভেঞ্চারসের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এক সাবেক সেনা কর্মকর্তা থেকে ১৫ কোটি টাকা এবং ফাইবার হোম লিমিটেড থেকে ১২ কোটি টাকা ফেরত দেয়নি। মূলত এসবিকে টেক ভেঞ্চারস লিমিটেড সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগ থেকে মূলধন সংগ্রহ করে ছোট স্টার্টআপ বা উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগ করত। তবে অভিযোগ উঠেছে যে এক পর্যায়ে তারা বিনিয়োগ বা ঋণ না দিয়ে প্রতারণা করত। গত অক্টোবর মাসে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলো—মার্কোপোলো, ফসল, যাত্রী, ১০ মিনিট স্কুল, অরোগা ও সোলশেয়ার—এসবিকে টেক ভেঞ্চারস ও সোনিয়া কবিরের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ দায়ের করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসবিকে টেকের সিইও সোনিয়া কবির কেবল দেশের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা করেননি, তিনি সিঙ্গাপুরের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন। সিঙ্গাপুরের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম ডি ইনভেস্টমেন্ট ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ডিআইভিসি)-এর সঙ্গে ১৫ লাখ ডলারের শেয়ার বিক্রির চুক্তি করেছিল সোনিয়া কবিরের প্রতিষ্ঠান এসবিকে টেক ভেঞ্চারস লিমিটেড। তাদের টাকা আত্মসাৎ করায় সোনিয়ার বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুরে ওই প্রতিষ্ঠানটি মামলা করেছে।
এসব বিষয়ে বক্তব্যের জন্য সোনিয়া কবিরের গুলশান ২ নম্বরের অফিসে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তাঁর বারিধারার বাসায়ও তিনি নেই বলে নিরাপত্তাকর্মীরা জানান। এরপর তাঁর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন ও বার্তা দিলেও তিনি সাড়া দেননি। তাঁর অফিসের একজন সহকর্মী জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন।
সোনিয়া কবিরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় এনআই অ্যাক্টের মামলার দুটি পরোয়ানা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
