Header – After

প্রকৃত করের ওপর সারচার্জ আরোপ হচ্ছে

কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে সরকার সারচার্জ সংক্রান্ত বিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনে বর্ধিত করের পরিবর্তে প্রকৃত করের ওপর সরাসরি সারচার্জ আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো—করদাতারা যেন আরও স্বচ্ছভাবে তাঁদের প্রকৃত সম্পদের বিবরণ কর রিটার্নে উপস্থাপন করেন, সে বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া। বর্তমানে যেকোনো করদাতার সম্পদ ৪ কোটি টাকার বেশি হলে তাঁকে ধাপে ধাপে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ দিতে হয়, যা মূল করের ওপর আরোপ করা হয়। প্রস্তাবিত এই পরিবর্তন মূলত উচ্চ আয়ের করদাতাদের লক্ষ্য করে আনা হচ্ছে।

বর্তমানে ব্যক্তি খাতের আমদানিকারকদের আমদানির সময় অগ্রিম আয়কর (এআইটি) পরিশোধ করতে হয়। তবে বছরের শেষে দেখা যায়, কেটে রাখা এআইটির পরিমাণ অনেক সময় করদাতার প্রকৃত করের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। এই অতিরিক্ত করের ওপর আবার সারচার্জ আরোপ করা হয়। ফলে করদাতাকে একদিকে প্রকৃত করের চেয়ে বেশি পরিমাণ কর দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে সেই অতিরিক্ত করের ওপরও সারচার্জ দিতে গিয়ে আর্থিকভাবে আরও চাপের মুখে পড়ছেন।

ধরা যাক, আমদানি পর্যায়ে একজন আমদানিকারকের কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) হিসেবে ১০০ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। অথচ বছর শেষে হিসাব অনুযায়ী তার প্রকৃত করযোগ্য পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ টাকা। যদি ওই করদাতার ৪ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকে (যেকোনো ধরনের), তাহলে তাকে করের ওপর সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ দিতে হয়। বর্তমান ব্যবস্থায় এই সারচার্জ গণনা করা হয় ১০০ টাকার ওপর ভিত্তি করে, যার ফলে সারচার্জ দাঁড়ায় ৩৫ টাকা—যা প্রকৃত করের তুলনায় অনেক বেশি।

কিন্তু যদি সারচার্জ গণনা প্রকৃত করের ভিত্তিতে করা হতো, তাহলে ওই আমদানিকারককে ৫০ টাকার ওপর সারচার্জ দিতে হতো। সেক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ হারে সারচার্জ দাঁড়াত ১৭.৫ টাকা—যা বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় অর্ধেক কম। প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই দিকেই এগোচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের অসন্তোষ ছিল, কারণ বিদ্যমান পদ্ধতিতে তাদের করের চাপ বাড়ে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, অতিরিক্ত এই করের কারণে তারা কর রিটার্নে প্রকৃত সম্পদের তথ্য দিতে নিরুৎসাহিত হন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সিনিয়র কর্মকর্তা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, জানান—বর্তমানে করদাতাদের থেকে যে পরিমাণ অগ্রিম কর কেটে নেওয়া হয়, তা প্রকৃত করের চেয়ে বেশি হলেও সেই পূর্ণ পরিমাণের ওপরই সারচার্জ ধার্য করা হয়। তার ভাষায়, ‘কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং করদাতাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শিগগিরই কেবল প্রকৃত করের ওপর সারচার্জ আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে করদাতারা আরও স্বচ্ছভাবে প্রকৃত আয় ও সম্পদের তথ্য উপস্থাপন করতে আগ্রহী হবেন এবং সম্পদ গোপনের প্রবণতাও কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

আসন্ন ২ জুন অর্থ অধ্যাদেশ জারির সময় অর্থ উপদেষ্টা এই পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারেন। করদাতা ও অর্থনীতিবিদরা এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে তারা মনে করেন, শুধু সারচার্জ পদ্ধতি সংস্কারই নয়, অগ্রিম কাটা কর যেন বছর শেষে প্রকৃত করের সঙ্গে সমন্বয় করা হয় কিংবা অতিরিক্ত অংশ ফেরত (রিফান্ড) দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করাও সময়োপযোগী ও ন্যায়সঙ্গত হবে।

স্নেহাশীষ মাহমুদ অ্যান্ড কোম্পানির কর বিশেষজ্ঞ ও ম্যানেজিং পার্টনার স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় উৎসে কর্তন বা সংগ্রহকৃত কর অনেক সময় ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচিত হয়, যার ফলে কার্যকর করহার (ইফেক্টিভ ট্যাক্স রেট) আইনানুগ হারের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। এই বাড়তি করের ওপর আবার সারচার্জ আরোপ করায় বৈষম্য আরও বেড়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদিও সারচার্জ বিধান সংশোধনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়, তবে প্রকৃত স্বস্তি পেতে হলে উৎসে কর কর্তন ও সংগ্রহের হার যথাযথভাবে যৌক্তিকীকরণ করতে হবে, যাতে অগ্রিম অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের পরিস্থিতি এড়ানো যায়।’