পে স্কেলের টাকা যাচ্ছে ভর্তুকি ও ঋণ মওকুফে

** বেতন কমিশনের ৪০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের
** ৩৯ হাজার ৩৮ কোটি অন্য খাতে
** জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ২৪ হাজার কোটি
** কৃষিঋণ মওকুফে ১৫ হাজার কোটি
** ফ্যামিলি কার্ডে ৩৮ কোটি ৭ লাখ
** কৃষি কার্ডের আর্থিক সুবিধা চূড়ান্ত হয়নি
** অবশিষ্ট রয়েছে ৯৬১ কোটি ৯৩ লাখ
** নতুন বেতন কমিশন বাস্তবায়ন আপাতত নয়

সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ঘোষিত নতুন বেতন কমিশন বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রায় পুরো অংশই অন্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে। এর সিংহভাগ গেছে জ্বালানি খাতের ভর্তুকিতে, বাকিটা স্থানান্তরিত হয়েছে বিএনপি নির্বাচনি ইশতেহারের অংশ হিসেবে কৃষিঋণ মওকুফ এবং ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে। অবশিষ্ট অর্থের একটি অংশও কৃষি কার্ড কর্মসূচিতে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরে নতুন পে-কমিশন কার্যত বাস্তবায়ন হওয়া সম্ভব নয় বলে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়নের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা আলাদা করে রাখা হয়। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার বদলে যায়।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা প্রত্যাশিতই ছিল। সরকার ক্ষমতা ছাড়ার কয়েক দিন আগে এ ধরনের বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনোভাবেই সঠিক হয়নি।’ যেহেতু এই বিষয়ে বিস্তারিত জানা নেই বলে বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ফলে শুরু হওয়া চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ইরানের হামলার কারণে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ, হরমুজ প্রণালী, প্রায় বন্ধ রয়েছে। সরবরাহ সংকটের কারণে তেল ও গ্যাসের দাম বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ হল জ্বালানি আমদানির অতিরিক্ত ব্যয় মোকাবেলা করা। ফলে তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হয়েছে। এছাড়াও, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদ ও মূল পরিশোধ এবং ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নতুন অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, বেতন-ভাতা খাতে অতিরিক্ত যে ৪০ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এই অর্থ থেকে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে ভর্তুকি হিসেবে চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কৃষিঋণ মওকুফের জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে সরকার এই অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র পরিবারকে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে চালু হওয়া পরিবারের একজন নারী সদস্যকে মাসিক আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা দিতে ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে তারেক রহমানের সরকার। পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে এর জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব খাতে বরাদ্দ দেওয়ার ফলে বেতন কমিশনের জন্য সংরক্ষিত অর্থের প্রায় পুরোটা ব্যয় হয়ে গেছে। হিসাব অনুযায়ী, ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৯ হাজার ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৯৬১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়ন করা বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত হওয়ায় আপাতত তা বাস্তবসম্মত নয়। কমিশন কার্যকর করতে বিপুল অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান বাজেট কাঠামোর মধ্যে জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য যে প্রস্তুতি ছিল তা এখন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ সরকারের আর্থিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। তাই চলতি অর্থবছরে বেতন কমিশন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই। তিনি আরও জানান, বাজেটের বড় অংশ ইতোমধ্যে জরুরি খাতে বরাদ্দ হওয়ায় এই পরিস্থিতি দ্রুত বদলানোর সম্ভাবনাও কম।

এদিকে বেতন বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করায় সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ হতাশা প্রকাশ করেছেন। একাধিক সরকারি কর্মচারী জানিয়েছেন, তারা বুঝতে পারছেন যে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। তবুও তারা আশা করছেন, সরকার যদি পুরো কমিশন বাস্তবায়ন করতে না পারে, তাহলে অন্তত আংশিক কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে। একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বেতন কমিশন বাস্তবায়ন করা হবে না— এমন তথ্য আমরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি। তবে সরকার চাইলে অন্তত কিছু অংশ বাস্তবায়ন করতে পারে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির এই সময়ে সামান্য বেতন বৃদ্ধি হলেও তা সরকারি কর্মচারীদের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে’।