আর্থিক সংকট ও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল ঘোষণার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে এ উদ্দেশ্যে গঠিত পে-কমিশনকে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে পে-স্কেল ঘোষণা সম্ভব না হলেও একটি নীতিগত কাঠামো (ফ্রেমওয়ার্ক) প্রস্তুত করা হবে। এ বিষয়ে সর্বশেষ বৃহস্পতিবার পে-কমিশনের একটি দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান। কমিশন সূত্র জানায়, চূড়ান্ত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে। সময় স্বল্পতার কারণে এ সরকারের পক্ষে তা ঘোষণা করা সম্ভব হবে না; বরং প্রতিবেদনটি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের জন্য পে-কমিশন গঠন করা হলেও এর ঘোষণা কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমানে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। পাশাপাশি আর্থিক সংকটের কারণে নির্বাচনের আগে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে পে-কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর বর্তমান সরকার সেই আলোকে বেতন কাঠামোর সুপারিশমালা চূড়ান্ত করবে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন পে-স্কেল ঘোষণা ও কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মহার্ঘ ভাতা পেতে থাকবেন। সূত্র আরও জানায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো—নবম পে-স্কেল নির্ধারণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে আগামী ২১ জানুয়ারি পে-কমিশনের চূড়ান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে নতুন বেতন স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে, যা পরবর্তীতে প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হবে। তবে এ সংক্রান্ত নির্দিষ্ট তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমকে বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার কোনো সম্ভাবনা নেই। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না, যা বাস্তবতার দিক থেকেই যুক্তিযুক্ত। এদিকে পে-কমিশনের আরেকটি সূত্র জানায়, বেতন কাঠামোর অনুপাত নিয়ে তিনটি প্রস্তাব—১:৮, ১:১০ ও ১:১২—উত্থাপন করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ১:৮ অনুপাত চূড়ান্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে—২১ হাজার, ১৭ হাজার এবং ১৬ হাজার টাকা। এসব বিষয়ে পরবর্তী সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। প্রস্তাবিত ১:৮ অনুপাত অনুযায়ী, সর্বনিম্ন (২০তম) গ্রেডের বেতন ১০০ টাকা ধরা হলে সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন হবে ৮০০ টাকা।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের লক্ষ্যে গত ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫ গঠন করা হয়। কমিশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খান। বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ দেওয়াই কমিশনের প্রধান কাজ। নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন কর্মচারীর পারিবারিক সদস্যসংখ্যা ছয়জন ধরে আর্থিক ব্যয়ের হিসাব করা হচ্ছে। কমিশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় গত মাসের ১৪ তারিখ। সে হিসাবে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কমিশনের ছয় মাসের মেয়াদ পূর্ণ হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
অবশ্য অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কমিশনকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছি। এ ক্ষেত্রে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে। আমাদের পরিকল্পনা হলো, সময় উপযোগী একটি বেতন কাঠামো ঘোষণা করা। তবে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিও চলছে। আমরা সময় পেলে ঘোষণা করে যাব। আর সেটা নতুন সরকার এসে বাস্তবায়ন করবে।’
** জানুয়ারি থেকে পে-স্কেল চায় সরকারি কর্মচারীরা
** পে-স্কেল বাস্তবায়নে কঠোর আলটিমেটাম
** নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে যেসব সুবিধা বাতিল হবে
** নতুন পে-স্কেল ঘোষণা পেছাচ্ছে
** নবম পে-স্কেলসহ ৫০% মহার্ঘ ভাতার দাবি
** নবম পে স্কেল নিয়ে কমিশনে ৩ প্রস্তাবনা
** ৮২ শতাংশ সরকারি কর্মচারী আয়করমুক্ত
** সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে বসছে জাতীয় বেতন কমিশন
** ‘নতুন বেতন কাঠামোর রূপরেখা দিয়ে যাবে সরকার’
** ‘আগামী সরকার নতুন বেতনের সিদ্ধান্ত নেবে’
