সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেলের কারণে সরকারের যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তা মেটাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের উপায় খুঁজতে বলা হয়েছে। গতকাল ১ সেপ্টেম্বর এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ নির্দেশনা দেন। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬.০৪ লাখ কোটি টাকা—যা আগের অর্থবছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪.১৫ লাখ কোটি টাকা। কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধি অর্জন বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজস্ব আদায়ে কখনোই ২৭ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধির রেকর্ড নেই।
সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, নতুন পে স্কেলের জন্য বাড়তি যে টাকা প্রয়োজন হবে, তা এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমেই মেটাতে হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘উপদেষ্টা আমাদের বলেছেন, যেকোনো মূল্যে চলতি অর্থবছরের রাজস্বের লক্ষ্যমত্রা অর্জন করতে হবে।’ আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে—এনবিআরকে এই অর্থের জোগান দিতে হবে বলে আমাদের বলা হয়েছে।’
সরকার সোমবার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল ঘোষণা করেছে। এর ফলে ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি উপকৃত হবেন। নতুন পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়নে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনীতির বর্তমান মন্থরতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। বিশেষ করে যেসব পণ্য থেকে বেশি আমদানি শুল্ক আদায় হয়, সেসব পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ইতিমধ্যেই ধীরগতি দেখা গেছে। ইতিমধ্যে সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে গেছে, অথচ এনবিআর এখনও জুলাইয়ের রাজস্ব আদায়ের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এনবিআর কর্মকর্তা জানান, জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই মাসে ছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। এছাড়া সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে ভ্যাট আদায় আরও কমে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১১ হাআজ্র ৮১ কোটি টাকা।
কর্মকর্তারা জানান, আমদানি শুল্ক ট্যাক্স আদায়ও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম বলে জানা গেছে। তবে এর কোনো পরিসংখ্যান জানা যায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য উপদেষ্টা তিতুমীরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অবাস্তব।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, এনবিআরের কাঠামোগত দুর্বলতা ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে রাজস্ব আদায়ের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। তাঁর মতে, কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এনবিআরের সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অনুকূলে নয়। ফলে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। তিনি বলেন, এনবিআরে এখনো তেমন কোনো অর্থবহ সংস্কার হয়নি। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের দক্ষতারও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। একই সঙ্গে করের আওতা বাড়াতেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ কমে যাওয়া, শিল্প খাতের সংকোচন এবং নতুন করে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আমদানিও কমেছে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি ভালো না থাকলে ভ্যাট ও কর আদায়েও গতি আসবে না।
