পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে নতুন কর সুবিধা

পুঁজিবাজারকে চাঙ্গা করতে একগুচ্ছ নতুন কর সুবিধা দিয়ে অর্থবিল-২০২৬ পাস করা হয়েছে। এতে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, কালো টাকা সাদা করার বিধান বাতিলসহ বিভিন্ন সংশোধনী আনা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে—ব্যাংক হিসাব খোলায় বাধ্যতামূলক টিআইএন প্রত্যাহার, মুদি দোকান ও কাঁচাবাজারকে ভ্যাটমুক্ত করা এবং কোম্পানির লভ্যাংশের ওপর করহার ২০ শতাংশ বহাল রাখা। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংশোধনীসহ বিলটি উত্থাপন করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে এসব সংশোধন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পাস হওয়া অর্থ অনুযায়ী, জিরো-কুপন বন্ড থেকে অর্জিত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখা, কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে, তারা যত পরিমাণ শেয়ারই ছাড়ুক না কেন— করহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানো হবে। এ ছাড়া প্রাথমিক গণপ্রস্তাব, সরাসরি তালিকাভুক্তি, অধিকার শেয়ার ইস্যু অথবা পুনরায় গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে কোনো কোম্পানি যদি অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার পুঁজিবাজারে বিক্রির জন্য ছাড়ে, তাহলে তারা আরও ২ দশমিক ৫ শতাংশ কর ছাড় পাবে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, তালিকা বা নন-তালিকাভুক্ত কোম্পানি যদি তাদের সব ধরনের লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করে, সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২ দশমিক ৫ শতাংশ কর সুবিধা পাবে। এ ছাড়া কোম্পানির লভ্যাংশের ওপর করহার ২০ শতাংশ বহাল এবং ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর লভ্যাংশের ওপর করহার কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশসংক্রান্ত প্রস্তাবটিও প্রত্যাহার করা হয়েছে, কারণ এটি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে অনেক জমি প্রকৃত বাজারমূল্যের পরিবর্তে মৌজামূল্যে নিবন্ধিত হওয়ায় করদাতাদের জটিলতা থেকে রক্ষা করতেই আনা হয়েছিল এ প্রস্তাব। তবে জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকার এটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে না।

জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ায় আরও দুটি প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে—বেশিরভাগ ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে এবং বণ্টন দলিল (পার্টিশন ডিড) ও নামজারি (মিউটেশন) নিবন্ধনে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার বিধান। একই সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়কর হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। চিংড়ি খাতকে সহায়তা দিতে আমদানি করা চিংড়ির খাদ্য, প্রোবায়োটিক, ভিটামিন, খনিজসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি ওষুধ ও অন্যান্য উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত আমদানি করা মধুর ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিল্পে বহুল ব্যবহৃত পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ এবং ফায়ার ডোর তৈরির কোল্ড-রোলড শিট, ফ্ল্যাট স্টিল পণ্যের কোটেড ক্রোমিয়াম অক্সাইড ও বৈদ্যুতিক কেবল উৎপাদনে ব্যবহৃত রিফাইন্ড কপার ওয়্যারের ওপর প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে; পাশাপাশি আমদানি করা ফায়ার ব্রিকের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও অগ্রিম করও বাতিল করা হয়েছে।

দেশীয় কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা অপরিশোধিত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ১৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এলইডি বাতি এবং প্রিফেব্রিকেটেড ভবন তৈরির কাঁচামাল আমদানির শুল্ক সুবিধার মেয়াদ ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এদিকে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বৈধ চ্যানেলে অর্থ লেনদেনকে উৎসাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারে ভ্যাট ১৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে বিদেশে অবৈধ অর্থ লেনদেন কমবে এবং কর দেওয়ার প্রবণতা বাড়বে। এ ছাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে সোনা, প্লাটিনাম ও হীরার গয়নার ভ্যাট ২ হাজার ৫০০ এবং রুপার ১০০ টাকা।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি চুক্তির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি এবং সরবরাহকারী পর্যায়ে সব ধরনের মাছ সরবরাহে পূর্ণ ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছে। পাস হওয়া অর্থবিল অনুযায়ী, দেশীয় মোটরগাড়ি শিল্পকে উৎসাহিত করতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর পরিশোধ সহজ করতে নির্বাচিত কয়েকটি খাতে ভ্যাট ব্যবস্থায় কো-ইফিশিয়েন্ট দাখিলের বাধ্যবাধকতাও শিথিল করা হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের করপোরেট করহার ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ডেস্কটপ কম্পিউটার আমদানিতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ৫ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা সব ধরনের সেবার ওপর ১৫ শতাংশ অভিন্ন হারে মূসক আরোপ এবং ব্যক্তিগত স্বর্ণের মূলধনি মুনাফার ওপর করহার প্রথমে ১৫ শতাংশ ঘোষণা করা হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ডেভেলপারদের সঙ্গে চুক্তির আওতায় জমির মালিকদের নগদ অর্থ, ফ্ল্যাট বা অন্যান্য সুবিধার ওপর কর পরিশোধ সহজ করতে তিন বছরে সমান কিস্তিতে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।