পাবনায় পেঁয়াজ পচনে বড় ক্ষতির মুখে চাষিরা

দেশের অন্যতম শীর্ষ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা পাবনায় ভালো ফলনের স্বস্তি এখন চাষিদের জন্য চরম দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়েছে। চৈত্র-বৈশাখ মাসে সংরক্ষণ করা পেঁয়াজ বর্ষা মৌসুমেই পচে নষ্ট হতে শুরু করায় বিপাকে পড়েছেন তারা। চাষিদের ভাষ্য, সাধারণত কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে পেঁয়াজে সামান্য পচন বা অঙ্কুর গজানো স্বাভাবিক হলেও ভরা বর্ষায় এমন পচন আগে কখনো দেখেননি তারা। ঐতিহ্যবাহী মাচা বা চাতালে সংরক্ষণ তো বটেই, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তৈরি আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থাতেও পেঁয়াজের এই পচন ঠেকানো যাচ্ছে না।

আটঘরিয়া উপজেলার চান্দাই গ্রামের কৃষক আয়েন উদ্দিন বলেন, তিনি সনাতন পদ্ধতিতে মাচায় প্রায় ২৫০ মণ হাইব্রিড পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেছিলেন। সম্প্রতি মাচা থেকে পেঁয়াজ বের করতে গিয়ে দেখেন, বড় একটি অংশ পচে গেছে। একই উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান জানান, মৌসুমের শুরুতে বিভিন্ন হাট ও এলাকা থেকে বাছাই করে সাড়ে তিন মণ পেঁয়াজ কিনে মজুত করেছিলেন। দাম বাড়লে বিক্রি করে লাভ করার আশা ছিল তার। কিন্তু এবার এত দ্রুত পেঁয়াজ পচে যাবে, তা তিনি ভাবতেও পারেননি। গত ৭-৮ বছর ধরে পেঁয়াজ মজুতের সঙ্গে জড়িত সিদ্দিকুর বলেন, আগের কয়েক বছর ভালো লাভ হলেও এবার লাভের সম্ভাবনা খুবই কম।

সুজানগর উপজেলার বনকোলা গ্রামের কৃষক উকিল উদ্দিন কৃষি বিপণন বিভাগের আধুনিক সংরক্ষণাগারে ৪০০ মণ দেশি পেঁয়াজ নিয়ম মেনে রেখেও পচন ঠেকাতে পারেননি। সাথিয়ার ক্ষেতুপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, বাজারে ভালো পেঁয়াজ মণপ্রতি ১৫০০-১৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও পচা পেঁয়াজ ৩০০-৭০০ টাকার বেশি বলছে না ক্রেতারা। তার ২৮০ মণ পেঁয়াজের অর্ধেক নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন আসল উৎপাদন খরচ তোলা নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পাবনা জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৫৪ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে রেকর্ড ৯ লাখ ৯৫ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। সাধারণত জেলার চাহিদা মিটিয়ে সারা দেশে সরবরাহ করা হয় পাবনার পেঁয়াজ। তাই কৃষকরা নানা উপায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রাখেন। বর্তমানে জেলায় প্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার টন পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। কিন্তু এবার অতিরিক্ত আর্দ্রতায় পেঁয়াজ থেকে অঙ্কুর গজিয়ে তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই সংরক্ষিত দেশি ও হাইব্রিড উভয় জাতের পেঁয়াজের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে বলে দাবি চাষিদের।

কৃষি কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের মতে, পেঁয়াজ তোলার সময় শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির কারণে কন্দে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থেকে যাওয়া, দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উপযোগী নয় এমন হাইব্রিড জাতের চাষ, অতিরিক্ত সার ও রাসায়নিকের ব্যবহার এবং গাদাগাদি করে সংরক্ষণ করায় মূলত পচন ধরেছে। এর সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে আধুনিক সংরক্ষণাগারের যন্ত্রপাতি নিয়মিত চালু রাখা সম্ভব না হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে। তবে ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’ ব্যবহারকারী চাষিদের পেঁয়াজ তুলনামূলক কম নষ্ট হচ্ছে। পেঁয়াজের পচন রোধে এখন পর্যন্ত কৃষকদের মধ্যে ৫ হাজার ৩৩০টি এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, এ বছর পেঁয়াজের ফলন রেকর্ড পরিমাণ বেশি হয়েছিল। তার মধ্যেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পচন বাড়ায় কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে জাতীয় বাজারে পেঁয়াজের কোনো সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা নেই বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।