রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় কাকলি ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুটের কারখানায় রুটি, বিস্কুট, কেকসহ বিভিন্ন ধরনের বেকারি পণ্য তৈরি করা হয়। পরে ভ্যানের মাধ্যমে প্রতিদিন মালিবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এসব পণ্য বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি। কারখানাটির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানান, সাধারণত তাঁর কারখানা থেকে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হতো। সব খরচ বাদ দিয়ে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা মুনাফা থাকত। তবে গত এক বছরে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে গত এক মাসে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে। ফলে মুনাফার বদলে এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে।
আবদুল হান্নান বলেন, ‘ময়দা, চিনি, তেল ও গ্যাসসহ উৎপাদনের প্রায় সব কাঁচামালের দাম বেড়েছে। গত মাসে বিদ্যুৎ বিলও আগের তুলনায় অনেক বেশি এসেছে। সাত দিন আগে হিসাব করে দেখেছি, এক দিনেই আমার ১৮ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়ে যাব।’ এ খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, গত এক বছরে বিভিন্ন কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বেকারি পণ্য উৎপাদনের খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে উৎপাদন কমেছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশের ছোট ও মাঝারি আকারের বেকারি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছেন।
চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, গত দুই বছর ধরেই গ্যাসের সংকট রয়েছে। নিয়মিত লাইনের গ্যাস না পাওয়ায় অধিকাংশ কারখানা বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডারজাত এলপিজি ব্যবহার করছে। এতে তাদের জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার আগে সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক সময় ওভেনে থাকা পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন বেকারি ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ক্ষুদ্র বেকারির সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ৭০০টির বেশি বেকারি। এ খাতে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে সারা দেশে ৫০০ থেকে ৬০০টি ছোট বেকারি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
দাম বেড়েছে কাঁচামালের
রুটি ও বেকারি পণ্য তৈরির প্রধান কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে ময়দা, ভোজ্যতেল, ডালডা ও চিনি। এসব পণ্য উৎপাদনে গ্যাসও প্রয়োজন হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, গত ছয় মাসে প্রায় সব কাঁচামালের দাম বেড়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাস আগের তুলনায় খুচরা বাজারে প্রতি কেজি খোলা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ, খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৫ শতাংশ এবং চিনির দাম গড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত এক মাসে বাজারে খোলা আটা, ময়দা ও চিনির দাম আরও এক দফা বেড়েছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনি ১১০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ছিল ১০০ থেকে ১০৫ টাকা। একই সময়ে খোলা আটার দাম কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা এবং খোলা ময়দার দাম ৫ টাকা বেড়ে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে তাঁরা প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ময়দা ৩ হাজার ১০০ টাকায় কিনছেন। বছরখানেক আগে এটির দাম ছিল ২ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে ৮০০ টাকা। এভাবে একই সময়ে চিনির দাম বস্তাপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা; ডালডা কার্টনপ্রতি (১৬ কেজি) ৮০০ টাকা; সয়াবিন তেল ড্রামপ্রতি (১৮৫ কেজি) প্রায় ৫ হাজার টাকা বেড়েছে। তাতে সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ ২০-২৫ শতাংশ বেড়েছে।
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে পণ্যের ক্ষতি
সরেজমিন ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বেইলি রোড, খিলগাঁও, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার বেকারি কারখানাগুলোতে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। বর্তমানে অনেক কারখানায় ইলেকট্রিক ওভেনে পণ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ফলে একটানা বিদ্যুৎ না থাকায় প্রায়ই বেকিংয়ের জন্য প্রস্তুত করা পণ্য নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। তাঁরা বলছেন, লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর বা আইপিএস দিয়ে সাময়িক সহায়তা নেওয়া হয়। কিন্তু এখন একটানা কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়।
রোববার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক এলাকায় ছোট একটি দোকানে বৈদ্যুতিক চুলায় বাকরখানি তৈরি করছিলেন বাবুল চন্দ্র ঘোষ। তিনি দোকানটির ম্যানেজার। লোডশেডিং নিয়ে জানতে চাইলে বাবুল চন্দ্র বলেন, ‘দিনে অন্তত তিনবার বিদ্যুৎ যায়। বিদ্যুৎ গেলে আমাদের কাজও বন্ধ থাকে।’ শেখেরটেক ঘুরে মোহাম্মদি হাউজিং লিমিটেডের ৬ নম্বর রোডের মাথায় হক বেকারির কারখানায় গেলাম। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির কর্মী আব্দুল কুদ্দুস জানান, কারখানাটিতে লাইনের গ্যাস আছে। কিন্তু সেটিতে নিয়মিত গ্যাসের চাপ থাকে না। এ কারণে সিলিন্ডারের এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করেই তাঁরা পণ্য তৈরি করেন।
ঢাকার বাইরের চিত্র কী
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার রসুলবাগ এলাকায় সুইট নেশন বেকারির উৎপাদন কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক (অপারেশন) মো. শামীম বলেন, দিনে ১২ ঘণ্টার মধ্যে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা, কখনো দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে ঠিকমতো ওভেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দিনাজপুরের হৃদয় অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী ও রংপুর বিভাগীয় বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ জানান, দিনাজপুরের প্রায় ৭০ শতাংশ বেকারি বৈদ্যুতিক ওভেনে পরিচালিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এসব প্রতিষ্ঠান দিনে অন্তত ৩০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রতিদিনই কোনো না কোনো বেকারির পণ্য নষ্ট হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেকারি কারখানাগুলো এমনিতেই চাপে রয়েছে। এর মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটে কারখানা চালু রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ছোট কারখানাগুলো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংকঋণও পাচ্ছে না। ফলে গত ছয় মাসে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই প্রায় ২০টি বেকারি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। জালাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘আমরা যারা ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে ছোট ব্যবসা করি, পুঁজি ভেঙে চলতে চলতে এখন পুরোপুরি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী ছয় মাসে দেশের ১০ শতাংশ বেকারি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমরা এই সংকট থেকে পরিত্রাণ চাই। আমরা ব্যবসা চালিয়ে যেতে চাই।’
