গত পাঁচ বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৩ শতাংশে। শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত ‘২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন: পর্যালোচনা ও সংস্কার সুপারিশ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী মোটরসাইকেল। ২০২৫ সালে মোট ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন প্রাণ হারান, যা ওই বছরে মোট নিহতের ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে ৪ হাজার ৭৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৩১ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৩৭৯ জন আহত হন। পাঁচ বছর পর ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৫৮৪টিতে। সে বছর নিহত হন ৭ হাজার ৩৫৯ জন এবং আহতের সংখ্যা বেড়ে হয় ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিহত মোটরসাইকেল আরোহীদের বড় অংশই ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী যুবক। দেশে মোট মোটরযানের প্রায় ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল হলেও এ খাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ১,৫৬৪ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২১.২৫ শতাংশ। এছাড়া ১,০০৮ শিশু নিহত হয়েছে, যাদের প্রায় অর্ধেকই পথচারী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কে শিশু ও পথচারী মৃত্যুর হার বেশি। সড়ক শিশুবান্ধব না হওয়া, ফুটওভার ব্রিজের অপ্রতুলতা এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ২,১৩৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২,০১৮ জন—যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনার বড় অংশ ঘটেছে রাতে (৪১.৫৬ শতাংশ), যেখানে ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল একটি বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মানব সম্পদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫,৫৫০ কোটি ৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা। অপ্রকাশিত তথ্য যোগ করলে এই ক্ষতি জিডিপির ১.৫ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
সংস্থাটির সুপারিশে বলা হয়েছে, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন করতে হবে এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন ক্যাডারের বদলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষ ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সুপারিশে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল নিরাপত্তা জোরদারে ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে এবং মানসম্মত হেলমেট বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যবাহী যানবাহন দ্রুত প্রত্যাহার এবং দক্ষ চালক তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

