কুমিল্লা, ফেনী, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও পাবনায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া বান্দরবানে পর্যটকবাহী বাস খাদে পড়ে ১৭ জন আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে পাঁচ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ৪২ জন। শনিবার (২১ মার্চ) গভীর রাত থেকে রোববার (২২ মার্চ) সকাল পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটে। প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে এসব জানা গেছে।
কুমিল্লা : কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলায় যাত্রীবাহী বাস ও ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। তাদের কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শনিবার (২১ মার্চ) দিনগত রাত ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, দুইজন নারী ও তিন শিশু। তারা সবাই বাসের যাত্রী। তবে এখনো হতাহতদের নাম পরিচয় পাওয়া যায়নি। ময়নামতি হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল মোমিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ফেনী : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর রামপুর এলাকায় বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে ৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ৫ জন। রোববার (২২ মার্চ) ভোর চারটার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী-রামপুর এলাকায় চট্টগ্রাম অভিমুখী একটি লেনের কাজ চলছিল। এসময় একটি অ্যাম্বুলেন্স ধীর গতিতে পার হচ্ছিল। এসময় শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস অ্যাম্বুলেন্সটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। এ ঘটনায় বাস ও অ্যাম্বুলেন্স চালকের কথা কাটাকাটি শুরু হলে পেছনে মোটরসাইকেল ও আরও কিছু বাসের জট লেগে যায়। তার কিছুক্ষণ পর বেপরোয়া গতিতে আসা দোয়েল পরিবহনের একটি বাস জটলার মধ্যে ধাক্কা দেয়। এতে একজন মোটরসাইকেল আরোহী, বাসের সুপারভাইজার ও একজন যাত্রী নিহত হন। ৫ জন আহত হন।
হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জের মাধবপুরে বাস ও পিকআপ সংঘর্ষে মা-ছেলেসহ ৪ জন নিহত হয়েছেন। রোববার (২২ মার্চ) সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে উপজেলার আন্দিউড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে ৩ জনের পরিচয় মিলেছে। তারা হলেন- পিকআপ চালক সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার ইব্রাহিম মিয়া, কিশোরগঞ্জের আছমা আক্তার ও তার ছেলে সজিব (১২)। অপরজনের পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে তিনি আছমার স্বামী। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল রানা।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, ভোরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আন্দিউড়া এলাকায় একটি পিকআপ ও একটি বাসের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে পিকআপটি উল্টে মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। সকাল ৯টার দিকে স্থানীয়রা খাদে একটি পিকআপ উল্টে পড়ে থাকতে দেখে মাধবপুর থানা ও ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পিকআপের নিচে থেকে ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করে।
বান্দরবান : বান্দরবানের সুয়ালকে পর্যটকবাহী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে ১৭ জন যাত্রী আহত হয়েছেন। রোববার (২২ মার্চ) ভোর ৫টার দিকে বান্দরবান-কেরানিহাট সড়কের সুয়ালক কিউবি রেস্টুরেন্টের পাশে এই দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে আসা সৌদিয়া পরিবহনের একটি পর্যটকবাহী বাস বান্দরবান প্রবেশের মুখে সুয়ালক এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। যাত্রীদের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন এবং ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে বান্দরবান সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
পাবনা : সকালে পাবনা-নাটোর মহাসড়কের গড়মাটি কলোনি এলাকায় প্রাইভেটকারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছে ধাক্কা লেগে জুলফিকার ইসলাম জিল্লুর (২৬) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। আগামীকাল সোমবার বিয়ে পিঁড়িতে বসতেন তিনি। সেই বিয়ের দাওয়াত দিতে প্রাইভেটকার নিয়ে একাই যাচ্ছিলেন বোনের বাড়িতে। নাটোর বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে পিকআপ ভ্যানের চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্ধু নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। রোববার (২২ মার্চ) বিকেলে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব মহাসড়কের কুলিয়ারচর উপজেলার দাড়িয়াকান্দি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- দাড়িয়াকান্দি এলাকার বিজয় (১৮) ও তার বন্ধু জাবির হোসেন (১৮)। আহত অপর যুবককে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বাজিতপুরের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, তিন বন্ধু একটি মোটরসাইকেলে করে যাচ্ছিলেন। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা মুরগিবাহী একটি পিকআপ ভ্যান মোটরসাইকেলটিকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই বিজয় ও জাবির নিহত হন। কুলিয়ারচর হাইওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ সুমন কুমার চৌধুরী জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তবে দুর্ঘটনার পরপরই পিকআপ ভ্যানটি পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অপরদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কুমিল্লায় রেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি বগুড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার পর শনিবার দিবাগত মধ্যরাতে কুমিল্লায় ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ অবিলম্বে খুঁজে বের করতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি দুর্ঘটনার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন। আহতদের সুচিকিৎসার নিশ্চিত করতেও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন। নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তারও নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ট্রেন-বাস সংঘর্ষে তদন্ত করে প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতার জন্য দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী এ কথা জানিয়েছেন।-সূত্র বাসস।

এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফেনী, হবিগঞ্জ এবং জামালপুর সেতু দুর্ঘটনাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত এবং তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। রোববার এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, পবিত্র ঈদ উদযাপনের এই আনন্দঘন মুহূর্তে এসব দুর্ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং উদ্বেগজনক। প্রতিটি জীবন মূল্যবান। প্রতিটি মৃত্যুই অপূরণীয় ক্ষতি। প্রধানমন্ত্রী মহান আল্লাহর দরবারে নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। হতাহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জনগণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। এ বিষয়ে কোনো শৈথিল্য বরদাস্ত করা হবে না। একই সঙ্গে রেলক্রসিং ব্যবস্থাপনা, সেতুর নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা নিরাপদ করতে দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
