দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দারা বংশপরম্পরায় মাছ শিকার ও কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। তবে গত দুই দশকে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমনে দ্বীপের অর্থনীতির কাঠামো বদলে যায়। পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে দ্রুত পর্যটননির্ভর নানা ব্যবসায় যুক্ত হন স্থানীয়রা। কিন্তু এই পেশাগত পরিবর্তনই এখন তাদের জীবিকায় অনিশ্চয়তা ও সংকট তৈরি করেছে।
অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও প্লাস্টিকদূষণে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবেশ সুরক্ষা ও পর্যটন নিয়ন্ত্রণে গত দুই বছরে সরকার একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটকের সংখ্যা কমলেও পরিবেশের তেমন কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। উল্টোভাবে কাজ হারিয়ে বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন, আর কোথাও কোথাও শিশু-কিশোরদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সেন্ট মার্টিনে প্রতি বছর ১ অক্টোবর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত পর্যটন মৌসুম ধরা হয়। তবে ২০২৩ সাল থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাতের জেরে টেকনাফ থেকে নাফ নদীপথে সেন্ট মার্টিনগামী জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরে কক্সবাজার থেকে বিকল্পভাবে জাহাজ চলাচল শুরু হয়। দ্বীপের পরিবেশ ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সরকার পর্যটন মৌসুম সংক্ষিপ্ত করে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ১২টি নির্দেশনা জারি করে। এসব শর্ত মেনে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে কক্সবাজার থেকে জাহাজে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটককে দ্বীপে ভ্রমণ ও রাতযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। এ হিসাবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেছেন মোট ১ লাখ ১০ হাজার পর্যটক।
চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার। আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এটি কার্যকর থাকবে। নভেম্বরে ভ্রমণের সুযোগ থাকলেও রাতযাপনের অনুমতি থাকছে না।দ্বীপে ২০০টির বেশি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এগুলোতে ৮ থেকে ১০ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে। চলতি মৌসুমে এগুলোর অর্ধেকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া শতাধিক রেস্তোরাঁও বন্ধ হয়ে গেছে।
মারমেইড রিসোর্টের মালিক তৈয়ব উল্লাহ জানান, চলতি পর্যটন মৌসুমের দুই মাসে স্থানীয় আবাসিক রিসোর্ট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কার্যত কোনো ব্যবসা করতে পারেননি। তাঁর অভিযোগ, ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামভিত্তিক বড় রিসোর্টগুলো জাহাজের টিকিটসহ প্যাকেজ তৈরি করে পুরো ব্যবসা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। অন্যদিকে সি প্রবাল রিসোর্টের মালিক আবদুল মালেক বলেন, ‘দ্বীপে যেসব হোটেল ও রিসোর্টের বিচ ভিউ নেই, সেগুলোর অধিকাংশই বন্ধ রাখতে হয়েছে।’
সেন্ট মার্টিন জেটিঘাটের পাশে বালিয়াড়িতে মাচাংয়ে সামুদ্রিক মাছ শুকান দ্বীপের উত্তর পাড়ার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান (৬৫)। তিনি বলেন, সাগরে কয়েক বছর ধরে মাছের আকাল চলছে। এখন শুঁটকি তৈরির মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। আবার গভীর সাগরে যেতে চাইলে মগবাগির (আরাকান আর্মি) ভয় আছে। তারা অস্ত্র তাক করে যখন-তখন ধরে নিয়ে যায়। দু-তিন বছর ধরে এই পরিস্থিতি চলছে।
সেন্ট মার্টিনের ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, সাগরে মাছ ধরার সময় ধরে নিয়ে যাওয়া ৩৬ জন জেলে এখনো আরাকান আর্মির হাতে জিম্মি। তাঁর অভিযোগ, পরিবেশ রক্ষায় পর্যটন মৌসুমে পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসন সক্রিয় হলেও বাকি ১০ মাস কেউ স্থানীয়দের খবর রাখে না। এখানকার প্রায় ১০ হাজার বাসিন্দার বিকল্প আয়ের কী ব্যবস্থা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
