সকালে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ, আর বিকেলেই বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি—এমন নাটকীয় পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে গতকাল মঙ্গলবার তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ড. খলিলুর রহমানকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা হয়। বিশেষ করে রাখাইনে মানবিক করিডোর ইস্যুতে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাঁর পদত্যাগ দাবি করে। এমনকি তাঁর নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। একজন বিদেশি নাগরিকের হাতে জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর অর্পণ করায় ড. ইউনূস সরকারেরও সমালোচনা হয়েছিল।
ড. খলিলুর রহমানকে ঘিরে সমালোচনায় মুখ্য ভূমিকা রাখে বিএনপি। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে দলটির পক্ষ থেকে তাঁর পদত্যাগের দাবি তোলা হয়। বর্তমান সংসদে থাকা বিএনপির কয়েকজন সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হ্যাশট্যাগ খলিল মাস্ট গো’ প্রচারণাও চালান। গত বছরের ১৭ মে খুলনার সার্কিট হাউস ময়দানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সালাহউদ্দিন আহমেদ ড. খলিলুর রহমানের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, একজন বিদেশি নাগরিককে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া কতটা যৌক্তিক—তা বিবেচনা করা উচিত ছিল। তাঁর বক্তব্য ছিল, জাতীয় নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে বিদেশি নাগরিকের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে এবং রোহিঙ্গা করিডোর বা মানবিক করিডোর ইস্যু দেশকে জটিল পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।
তিনি ড. খলিলকে বিদায় করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে আপনি বিদায় করুন। হয় তিনি নিজে পদত্যাগ করবেন, না হলে আপনি তাঁকে বিদায় করবেন। এ দেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কোনো জাতীয় দায়িত্ব বিদেশি কোনো নাগরিকের হাতে থাকতে পারে না। বিদেশি নাগরিক ষড়যন্ত্র করছে বাংলাদেশে একটি অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য। আমরা তা হতে দেব না।’
তবে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফরের সময় লন্ডনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পেছনের কারিগর হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে খলিলুর রহমানের নাম এসেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প সরকার গঠনের পর ড. ইউনূস ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের জন্য ভরসা করেছেন তাঁর ওপর। মার্কিন শুল্ক আরোপ নিয়ে ঢাকা-ওয়াশিংটন যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছেছে, তাঁর পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ড. খলিল। আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করেছেন তিনি।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বেইজিংয়ে আয়োজিত কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ—এসব কূটনৈতিক পরিসরেও ড. খলিলুর রহমানকে সক্রিয় দেখা গেছে। ওই অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারিসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তবে গতকাল বিএনপির মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে ছাত্রনেতাদের পদত্যাগের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছিল বিএনপি। সেই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে পদত্যাগ করতে হয়।
গতকাল বিকেলে সংসদ ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিএনপির মন্ত্রী হিসেবে ড. খলিলের শপথ গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর বক্তব্য, এ ঘটনা প্রমাণ করে যে খলিলুর রহমান আগ থেকেই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। শিক্ষাজীবনে ড. খলিলুর রহমান কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। পরে ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে যোগ দেন। উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে টাফটস ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৩-৮৫ সময়ে খলিলুর রহমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে তাঁকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে বদলি করা হয়। ১৯৯১ সালে তিনি জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে জাতিসংঘ সচিবালয়ে যোগ দেন।
