বাংলাদেশে নিষিদ্ধ মাদক পপি বীজ চোরাচালান চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। ঢাকার ব্যবসায়ী আকবর হোসেন ইয়ামিন (৩০) এই চক্র গড়ে তোলার অভিযোগে নাম এসেছে। তিনি কখনও পাকিস্তান, কখনও মালয়েশিয়া থেকে পণ্য আনার সঙ্গে জড়িত। পপি আমদানির এলসি ও ব্যাংক লেনদেনের নথি তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ দিচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চারটি কৌশল ব্যবহার করে তিনি নিজেকে আড়ালে রেখেছেন।
এই চারটি কৌশল হচ্ছে– ১. পশুখাদ্য আমদানিকারকদের টার্গেট, বাড়তি লাভের লোভ, তিন তারকা হোটেলে বৈঠক, লাইসেন্স ব্যবহারের চুক্তি। ২. অর্থ জোগান ও স্থানান্তর এবং এলসি খোলা। ৩. পণ্য বন্দরে আসার পর আমদানিকারকের প্যাড ও সই জাল, পছন্দের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নিয়োগ, অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ ও কাস্টমসে নথিপত্র জমা। ৪. কাস্টমসে ধরা পড়লে আমদানিকারকের ভুয়া সইয়ে উচ্চ আদালতে রিট এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ।
সর্বশেষ ২২ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরে নিষিদ্ধ পপি ধরা পড়ে। মালয়েশিয়ার কোম্পানি ‘নুর অ্যান্ড সন্স’ থেকে আমদানি চুক্তি করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি মালয়েশিয়া থেকে পাখিপণ্য না পাঠিয়ে পাকিস্তান থেকে পপি বীজ পাঠায়। এতে ফেঁসে যান আমদানিকারক ‘মেসার্স আদিব ট্রেডিং’। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইয়ামিন আমদানিকারকের সঙ্গে প্রতি কেজিতে তিন টাকার লভ্যাংশের চুক্তিতে ৩২ হাজার কেজি পাখিখাদ্য আমদানির চুক্তি করেছিলেন। এই চক্রে বন্দরের জেটি সরকার সাহেদ হোসাইন এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এমএইচ ট্রেডিংয়ের মালিক মোক্তারের নামও উঠে এসেছে। চোরাচালান মামলা থেকে বাঁচতে হাইকোর্টে রিটও করা হয়েছে।
অভিযুক্ত আকবর হোসেন ইয়ামিন পুরান ঢাকার বীরেন বোস স্ট্রিটের মোস্তফা ট্রেড সেন্টারের মালিক। তিনি বলেন, ‘আমি পপি বীজ আমদানি করিনি। আমার আমদানি লাইসেন্সও নেই। যাদের লাইসেন্স দিয়ে আমদানি হয়েছে, তারা জানেন।’ আদিব ট্রেডিংয়ের মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জীবনে কোনো দিন পাকিস্তান থেকে পণ্য আমদানি করিনি। আরব আমিরাত থেকে ৯ বার পশুখাদ্য আমদানি করেছি। কিন্তু আমাকে লভ্যাংশের ফাঁদে ফেলে ইয়ামিন ও সাহেদ ফাঁসিয়েছে।
পণ্য আমদানি করতে আমদানিকারকের লাইসেন্সের বিপরীতে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বরাবর এলসি খোলা হয়। এ কারণে আমদানিকারক আদিব ট্রেডিংয়ের সাইফুলের চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ইসলামী ব্যাংক শাখার অ্যাকাউন্টে চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ১৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা পাঠান ইয়ামিন। অর্থ পাঠানো হয় তাঁর ইসলামী ব্যাংক, ঢাকার লালবাগ শাখার ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট থেকে। পাঠানো অর্থ ব্যবহার করে আমদানিকারক মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠান ‘নুর অ্যান্ড সন্স’-এর বরাবর এলসি খোলেন। তবে রপ্তানিকারক পাখিখাদ্যের স্থলে পপি বীজ পাঠান।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্য এলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং আমদানিকারকের সই ও সিল থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ইয়ামিন-সাহেদ চক্র আমদানিকারক সাইফুলের সই নেননি। নিজেরা সাইফুলের সিল-সই জাল করে কাস্টমসে নথি জমা দেন। পণ্য খালাসে বিভিন্ন দলিলে জাল সই দিয়ে ইয়ামিন তাঁর পছন্দের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট দিয়ে পণ্য খালাসের চেষ্টা করেন। এ ছাড়া সই জাল করে খামারবাড়ি থেকে ১০০ টন পশুখাদ্য আমদানির অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করেন। সর্বশেষ কাস্টমসের হাতে পপি ধরা পড়ার পর চোরাচালান মামলা থেকে বাঁচতে হাইকোর্টে আমদানিকারক সাইফুলের সই জাল করে রিট মামলা করেন ইয়ামিন। সিআইডি চট্টগ্রাম নগর ও জেলা পরিদর্শক নাছির উদ্দিন রাসেল বলেন, মালয়েশিয়া থেকে পপি বীজ চোরাচালানের হোতা হিসেবে আকবর হোসেন ইয়ামিনকে তদন্তে শনাক্ত করা হয়েছে। চোরাচালান মামলাটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শিগগির আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

