চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তির নীতিমালায় ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ফি সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে রাজধানীতে এই অঙ্কে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আংশিক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে আট হাজার এবং ইংরেজি ভার্সনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও অধিকাংশ স্কুল তা মানছে না। উন্নয়ন ও সেশন ফি আলাদাভাবে যোগ করে, এমনকি কোথাও কোথাও মার্চ পর্যন্ত অগ্রিম বেতন আদায় করে ভর্তি নেওয়া হচ্ছে। নীতিমালায় পুনঃভর্তি ফি নিষিদ্ধ থাকলেও নানা কৌশলে অতিরিক্ত অর্থ আদায় চলছে, ফলে ভর্তি ফি নিয়ে স্কুলে স্কুলে চরম নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে এবং এতে অভিভাবকরা মারাত্মক আর্থিক চাপে পড়ছেন।
রাজধানীসহ সারাদেশের নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি ও অন্যান্য ফি আদায়ে অনিয়ম দীর্ঘদিনের হলেও প্রতিবছর অভিযোগ ওঠার পরও তা ঠেকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। রাজধানীতে ভর্তি ফির নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগে শীর্ষে রয়েছে লিটল জুয়েলস স্কুল, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও সাউথপয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এদিকে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রথম থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন কার্যক্রম শুরু হয় ২১ নভেম্বর এবং শেষ হয় ৭ ডিসেম্বর; পরবর্তী সময়ে ১৪ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালায় বলা আছে, ‘সেশন চার্জসহ ভর্তি ফি সর্বসাকল্যে মফস্বল এলাকায় ৫০০ টাকা, পৌর উপজেলা এলাকায় এক হাজার টাকা, পৌর (জেলা সদর) এলাকায় দুই হাজার টাকা, ঢাকা ব্যতীত অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকায় তিন হাজার টাকার বেশি হবে না।’ বাস্তবে দেখা গেছে, সারাদেশের বেশির ভাগ স্কুলই এ নীতিমালা মানেনি। বেশির ভাগ বেসরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম প্রায় শেষ। তারা অতিরিক্ত ফি আদায় করেই ভর্তি নিয়েছে শিক্ষার্থীদের। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, অতিরিক্ত ভর্তি ফির কারণে অভিভাবকরা নিষ্পেষিত হচ্ছেন। এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর পুরানা পল্টনের লিটল জুয়েলস স্কুলে নার্সারিতে ভর্তিতে ৪০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। নীতিমালা অনুসারে তা ৩০ হাজার টাকা বেশি। উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের এক অভিভাবক জানান, তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে ইংরেজি মাধ্যমে তাঁর সন্তানকে ভর্তি করতে ১০ হাজার টাকা ফি দিয়েছেন। একই প্রতিষ্ঠানে তাঁর আরেক সন্তানকে প্রথম শ্রেণিতে ইংরেজি মাধ্যমে ১১ হাজার টাকায় ভর্তি করিয়েছেন। ভর্তি নীতিমালা অনুসারে তা এক হাজার টাকা বেশি। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে প্রথম শ্রেণি বাংলা মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা ও ইংরেজি মাধ্যমে ১২ হাজার টাকা লাগছে ভর্তি হতে। এর বাইরে বই-খাতা বাবদ আরও তিন হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিভাবকরা জানিয়েছেন।
মোহাম্মদপুর থানা শিক্ষা অফিসের ভেতরের কম্পাউন্ডে অবস্থিত মোহাম্মদপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি ও বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিতরণের সময় শিক্ষার্থীপ্রতি ৫০০ টাকা করে আদায় করার তথ্য মিলেছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানা শিক্ষা কর্মকর্তা নাইয়ার সুলতানা বলেন, যদি প্রধান শিক্ষক টাকা নিয়ে থাকেন, তা অনৈতিক ও অনিয়ম। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব। এদিকে রাজধানীর খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে প্রতি শ্রেণিতে বাংলা ভার্সনে আট হাজার টাকা ও ইংরেজি ভার্সনে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ২৮ হাজারের বেশি। অভিভাবকরা বলছেন, সর্বনিম্ন আট হাজার টাকা করে ধরলেও প্রতিষ্ঠানটি এ বছর ভর্তি থেকে সর্বনিম্ন আয় করেছে ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তাদের বক্তব্য, এ প্রতিষ্ঠানটি সচ্ছল। তারা ভর্তি ফি অনেক কম রাখতে পারত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ লায়লা আক্তার বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান আংশিক এমপিওভুক্ত। সরকার নির্ধারিত ভর্তি ফি নিয়ে থাকি। ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও একই ফি নিয়েছি। অভিভাবকদের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের একমাত্র আয় ভর্তি ফি ও টিউশন ফি। প্রতিষ্ঠানে জনবল এবং খরচ বেশি।
দেখা গেছে, ভর্তি ফির পাশাপাশি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিউশন ফিও সরকার নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি আদায় করছে। সরকারের টিউশন ফি নীতিমালা অনুযায়ী ঢাকায় বেসরকারি স্কুলে মাসিক বেতন ৭০০ টাকা এবং কলেজে এক হাজার ১০০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এ স্কুলের বাংলা মাধ্যমে আদায় করা হচ্ছে এক হাজার ৪৫০ টাকা এবং কলেজের বাংলা মাধ্যমে দুই হাজার ২০০ টাকা। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর জারি করা নীতিমালায় এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য টিউশন ফি ছাড়াও ২৩ ধরনের অতিরিক্ত ফি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে চারটি আলাদা ক্যাটেগরিতে ভাগ করা হয়েছে; পাশাপাশি টিউশন ফি নির্ধারণে মহানগর ও জেলা সদরে পৃথক কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কোন কোন খাতে এবং কত টাকা ফি আদায় করতে পারবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা, মুদ্রণ, টিফিন, ম্যাগাজিন, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবস উদযাপন, বিভিন্ন ক্লাব, লাইব্রেরি, কল্যাণ বা দারিদ্র্য তহবিল, আইসিটি, বাগান ও পরিচর্যা, ল্যাবরেটরি, স্কাউট, কমনরুম, পরিচয়পত্র, নবীনবরণ, বিদায় সংবর্ধনা, চিকিৎসাসেবা, বিবিধ, উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও শিক্ষা সফরসহ নানা খাতে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি ফি সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।
