নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত ১০, আহত ২,৫০৩

২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫০৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাব-এ আয়োজিত ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরবর্তী’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মো. ইজাজুল ইসলাম এ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিক, ১৫০টির বেশি স্থানীয় পত্রিকা এবং জেলা প্রতিনিধিদের সরবরাহ করা তথ্য ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংঘটিত নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনকেন্দ্রীক সাত শতাধিক সহিংসতার ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৫০৩ জন এবং নিহত হয়েছেন ১০ জন। এছাড়া এই সময়ে নির্বাচনী সহিংসতায় কমপক্ষে ৩৪ জনের অধিক গুলিবিদ্ধ এবং পাঁচ শতাধিক বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও নির্বাচনী কার্যালয়, ভোটকেন্দ্র ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, দলীয় মনোনীত প্রার্থী ও মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দল, হামলা-পাল্টা হামলা এবং সহিংসতার ঘটনাগুলোর ফলেই এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নির্বাচনী কার্যালয় ও ভোটকেন্দ্রে ভাঙচুর, ভোটারদের হুমকি দেওয়া, ভোটদান প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, নারী নির্যাতন, হেনস্তা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তত ২৫৪টি সহিংসতার ঘটনায় ১ হাজার ৬৫০ জন আহত এবং ৫ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে সহিংসতার ঘটনায় কমপক্ষে ২৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পাশাপাশি ২০০টির বেশি বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নির্বাচনী কার্যালয় ও ভোটকেন্দ্রে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে নির্বাচনের দিনে অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা-সংঘর্ষের তথ্য উল্লেখ্য করা হয়েছে, বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সহিংসতা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলেও সারাদেশের অধিকাংশ জেলায় নির্বাচনের দিনে ৩৯৩ টি অপরাধমূলক ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ছিল ১৪৯টি কেন্দ্রভিত্তিক বিশৃঙ্খলা, ১০৫টি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ৫৯টি ব্যালট স্টাফিংয়ের অভিযোগ, ১৯টি পোলিং এজেন্ট অপসারণ, ১৩টি নির্বাচনী কর্মকর্তার গাফিলতি, ১৮টি ভোটার বাধা, ৬টি প্রার্থীর ওপর হামলা, ৩টি ব্যালট বক্স ছিনতাই, ২টি অগ্নিসংযোগ এবং ৩১টি অন্যান্য অনিয়মের তথ্য উল্লেখযোগ্য।

ভোটের দিন সংঘর্ষে মোট ১৪৫ জন আহত হন এবং ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনিয়মের অভিযোগে ১৩ জন প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ৫৫টি ঘটনায় কারাদণ্ড বা জরিমানা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ৫ জন সাংবাদিক আহত হন এবং ৩টি কেন্দ্রের ভোট বাতিল করা হয়। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এআই ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানোর অন্তত ৬৪টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পর্যবেক্ষণের জন্য সংস্থাটি দেশের ৬৪ জেলায় ৫৬৫ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে। তারা ১০০টি আসনের ১ হাজার ৭৩৩টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেন। এর মধ্যে ৩৪৭ জন পর্যবেক্ষক ভোট গণনার সময় উপস্থিত ছিলেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচনী কর্মকর্তা ও প্রার্থীদের সমর্থকদের মাধ্যমে সংস্থাটির ৪৮ জন পর্যবেক্ষককে গণনাকক্ষে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি বা বাধা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনের নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার তথ্যে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন হবার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। সহিংসতার পৃথক ৩ টি ঘটনায় মুন্সীগঞ্জ ও বাগেরহাটের দুই যুবক এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে এক শিশু নিহত হয়েছেন। বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে অন্তত ৩০ টি জেলায় দুই শতাধিক পৃথক সংঘর্ষে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন এবং অন্তত ৩৫০ টি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

নির্বাচনকে ঘিরে নারী সহিংসতা, হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত অন্তত ৩২টি ঘটনায় কমপক্ষে ৪৫ জন নারী হেনস্তার শিকার হয়েছেন এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন। হেনস্তার শিকার নারীদের মধ্যে ৩৯ জন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর সমর্থক, ১ জন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর সমর্থক এবং ৫ জন অজ্ঞাত রাজনৈতিক দলের সমর্থক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৩২টি হামলা ও হেনস্তার ঘটনার মধ্যে ৩১টিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও এর সহযোগী সংগঠন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। অপর একটি ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। এদিকে হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়া নিয়ে এক তিন সন্তানের জননীকে (৩২) ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।