নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভোট প্রচারের জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, ড্রোন ও পোস্টার ব্যবহার সীমিত থাকবে এবং বিদেশে ভোট প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া একটি প্রার্থীর জন্য সর্বাধিক ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে না। একমঞ্চে ইশতেহার ঘোষণা এবং আচরণবিধি মেনে চলার অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। সোমবার ত্রয়োদশ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভোট প্রচারে কড়াকড়ি, অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার, পোস্টার ও ড্রোন ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণ করার নিয়মগুলো এ বিধিমালায় তুলে ধরা হয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে, পাশাপাশি দলের জন্যও ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রয়োজন মনে হলে তদন্তের পর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের আছে। প্রথমবারের মতো ভোট প্রচারে পোস্টার ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া একমঞ্চে প্রার্থীদের ইশতেহার ঘোষণা এবং আচরণবিধি মানায় দল ও প্রার্থীকে অঙ্গীকারনামা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং ২০০৮ সালের আচরণবিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখে এবার নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করে আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন অধ্যাদেশ জারির পর সোমবার আচরণবিধিটি গেজেট আকারে জারি করেছে নির্বাচন কমিশন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা
কোনো প্রার্থী, তার নির্বাচনী এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবে। তবে এর আগে প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্টকে, সম্পর্কিত সামাজিক মাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ইমেইল এবং অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্য রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করতে হবে।নির্বাচন-সংক্রান্ত কোনো প্রচারণায় অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না। ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভ্রান্ত তথ্য, কারও চেহারা বিকৃত করা বা বানোয়াট নির্বাচন-সংক্রান্ত তথ্যসহ ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা যাবে না। প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত আক্রমণ, উস্কানিমূলক ভাষা বা ঘৃণাত্মক বক্তব্য ব্যবহার নিষিদ্ধ। নির্বাচনী স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহারও করা যাবে না।
সামাজিক মাধ্যমে নির্বাচন-সংক্রান্ত কনটেন্ট শেয়ার বা প্রকাশের আগে অবশ্যই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হবে। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি ভোটার বিভ্রান্তি সৃষ্টি, কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্রহানি বা সুনাম ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে সামাজিক মাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে—সাধারণভাবে, সম্পাদিতভাবে বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে—মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করতে পারবে না।গুজব এবং এআই অপব্যবহার রোধে নির্বাচনী অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এবার নতুন ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে।
আচরণবিধিতে আরও যা রয়েছে– কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা, পথসভা, সভা-সমাবেশ বা কোনো প্রচারণা করতে পারবে না। ভোটের প্রচারে থাকছে না পোস্টারের ব্যবহার। একজন প্রার্থী তাঁর সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না; যার দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট আর প্রস্থ ৯ ফুট। নির্বাচনের দিন ও প্রচারের সময় কোনো ধরনের ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে অন্য কোনো প্রার্থী ও প্রতিষ্ঠান ভোটার স্লিপ বিতরণ করতে পারবেন। তবে ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করতে পারবেন না। বিলবোর্ডে শুধু যেগুলো ডিজিটাল বিলবোর্ড, সেগুলোতে আলোর ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যুতের ব্যবহার করা যাবে। তা ছাড়া আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেটে পলিথিনের আবরণ নয়, প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্বর্তী/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদেরও যোগ করা হয়েছে। ফলে তারা প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামতে পারবেন না।
ভোট প্রচারে পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে এবং প্রচারসামগ্রীতে পলিথিন ও রেসিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রচারের সময় শব্দস্তর সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেলে রাখতে হবে। আচরণবিধি মেনে চলার বিষয়ে প্রার্থী ও দলের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নেওয়া বাধ্যতামূলক। আচরণবিধির ‘গুরুতর’ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আরপিও অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে। আগে এটি আচরণবিধিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না, এবার নতুনভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনী অপরাধের ক্ষেত্রে ইসি আরপিও ৯১ ধারার অধীনে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা ব্যবহার করে। গণমাধ্যমের সংলাপ ও সব প্রার্থীকে একমঞ্চে ইশতেহার ঘোষণার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। রিটার্নিং অফিসার সংশ্লিষ্ট আসনের সব প্রার্থীর ইশতেহার বা ঘোষণাপত্র এক দিনে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। এ নির্বাচনেই প্রথমবার আইটি সমর্থিত পোস্টাল ভোটিং পদ্ধতি চালু হয়েছে। দেশের ভেতরের তিন ধরনের ভোটার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন।
আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশ এবং আচরণবিধি জারির মাধ্যমে নির্বাচনী আইনের সকল ধরনের সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। ইতিমধ্যে ভোটার তালিকা আইন, নির্বাচন কর্মকর্তা বিশেষ বিধান আইন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন সংশোধন, ভোটকেন্দ্র নীতিমালা, দেশি ও বিদেশি পর্যবেক্ষণ নীতিমালা, সাংবাদিক নীতিমালাসহ নির্বাচনী প্রক্রয়ায় প্রযোজ্য সব আইন ও বিধি সংস্কার করেছে নির্বাচন কমিশন।

