Header – After

নন-ব্যাংক ফাইন্যান্স খাতে সম্পদের চেয়ে দায় বেশি

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাপক লুটপাটের কারণে দেশের বেশির ভাগ নন–ব্যাংক ফাইন্যান্স কোম্পানি অর্থশূন্য হয়ে পড়েছে। ঋণের নামে চালানো এই লুটপাটের ফলে একদিকে অর্থ পাচার হয়েছে, অন্যদিকে সব ঋণ এখন খেলাপি হয়ে গেছে। এতে সম্পদের মান কমে গেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। মূলধনও সম্পূর্ণ ক্ষয়প্রাপ্ত, ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং আয় প্রায় নেই। বছরের শেষে মোটা অঙ্কের লোকসান দিতে হচ্ছে। নগদ অর্থের অভাবে অনেক কোম্পানি তাদের আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। ক্ষতির এই অবস্থার কারণে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর গড় হিসেবে সম্পদের চেয়ে দায়ের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ১০০ টাকার সম্পদের বিপরীতে দায়ের পরিমাণ এখন ১১৪ টাকা। ফলে কোম্পানিগুলোর সমুদয় সম্পদ বিক্রি করেও গ্রাহকদের দায় মেটানো সম্ভব হবে না। এ সব তথ্য ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পি কে হালদার একাই পাঁচটি ফাইন্যান্স কোম্পানিতে লুটপাট চালিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেউলিয়া করে দিয়েছেন। এছাড়া এস আলম দুটি কোম্পানিতে লুটপাট করেছেন। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আরও কয়েকটি কোম্পানিতেও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে মোট ১৩টি কোম্পানির প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে, যার বেশির ভাগই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। দেশের মধ্যে থাকা লুটের অংশ আদায় না হওয়ায় তা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। ফলে নন–ব্যাংক ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৭.৬৫ শতাংশ। এরপর তা বেড়ে ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের ৩৫.৭২ শতাংশ। খেলাপি ঋণের বৃদ্ধির পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী জামানত না থাকায় সম্পদের মান কমে গেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। এক বছর আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ছিল ৫৭ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা; গত জুনে তা বেড়ে ৬১ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণ ৭৭ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ঋণের ৮০ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণে পরিণত হয়েছে। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদসহ মোট সম্পদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকায়, যা কোম্পানিগুলোর ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়িয়েছে।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, কোম্পানিগুলোতে সম্পদের মান খারাপ হওয়ায় এর মান কমে গেছে। সম্পদ থেকে কোনো আয় হচ্ছে না। মূলধনও ক্ষয় হয়ে গেছে। ফলে কোনো আয় হচ্ছে না। এতে বাড়ছে না সম্পদ। অন্যদিকে দায়ের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের জুনে দায়ের চেয়ে সম্পদের পরিমাণ বেশি ছিল। একই বছরের সেপ্টেম্বরে সম্পদের চেয়ে দায়ের পরিমাণ বেড়ে যায়। কমে যায় সম্পদের পরিমাণ। এই হার ক্রমেই বাড়তে থাকে। ২০২৫ সালের জুন মাসের শেষের দিকে দায়-সম্পদ অনুপাত ১১৩.৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যা ২০২৫ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকের তুলনায় ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। সম্পদের চেয়ে দায় বেশি হওয়া আর্থিক খাতের জন্য একটি উদীয়মান উদ্বেগের বিষয় বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের মধ্যে ঋণ ঝুঁকি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০.৮৬ শতাংশ, অর্থাৎ সম্পদের মধ্যে বড় অংশই ঋণ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মূল কারণ হলো ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকা। ফলে এই ঋণগুলো আদায় হওয়ার সম্ভাবনাও কম। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, কোম্পানিগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ মূলধন রাখতে হয়। কিন্তু লুটপাটের কারণে খেলাপি ঋণ অব্যাহতভাবে বেড়ে যাওয়ায় মূলধন ক্রমেই ক্ষয় হয়েছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূলধন ১০ শতাংশের ওপরে থাকলেও এরপর তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ২০২৪ সালের মার্চে মূলধন কমে ৩.২৪ শতাংশে নেমে আসে এবং জুনে নেগেটিভে চলে যায় (৩.৩১ শতাংশ)। এরপর খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতির কারণে মূলধনের ক্ষয় আরও তীব্র হয়। ২০২৫ সালের জুনে নেগেটিভ মূলধনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২.৩০ শতাংশ। অর্থাৎ ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর গড় হিসেবে কোনো মূলধন নেই; উলটো মূলধন নেগেটিভ হয়ে আছে ১৬,১৭২ কোটি টাকায়। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান ভালোভাবে চলছে। বর্তমানে ৩৫টি ফাইন্যান্স কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৪টির মৌলিক মূলধন ১০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। বাকি ২১টির মূলধনে ঘাটতি রয়েছে, যার মধ্যে ১১টির কোনো মূলধনই নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে সেই ৯টি কোম্পানিকে বন্ধ করে পুনর্গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সামগ্রিক মূলধন অনুপাতের ক্রমাগত নেতিবাচক এবং সর্বনিম্ন স্তরের নিচে থাকায় তীব্র মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে-যা এই খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরে। ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর বর্তমানে কোনো মূলধন না থাকায় এ খাত থেকে তাদের কোনো আয়ও নেই। সম্পদ বা বিনিয়োগ থেকেও কোনো আয় নেই। গত জুনে এ খাতে লোকসান হয়েছে ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকা সম্পদের বিপরীতে লোকসান হচ্ছে প্রায় ৩ টাকা। এভাবে লোকসান বাড়ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থশূন্য হয়ে পড়ছে। অর্থ সংকটে গ্রাহকের দায় মেটাতে পারছে না।

ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোতে আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২,২৮৯ কোটি টাকায়। এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানির ঋণ গ্রহণ ও অন্যান্য দায় মিলিয়ে কোম্পানিগুলোর মোট দায় ১,০৪,৫৫১ কোটি টাকা, যা সমপরিমাণ সম্পদ দ্বারা আচ্ছাদিত নয়। ১১৪ টাকার দায়ের বিপরীতে সম্পদ আছে মাত্র ১০০ টাকা; অর্থাৎ ১৪ টাকা ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া সম্পদের প্রায় ৯১ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে এসব সম্পদ থেকে আয় কম হচ্ছে এবং নগদায়ন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে আমানতকারীদের দায় পরিশোধ করাও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে মোট আমানতের একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক-এ বিধিবদ্ধ আমানত হিসেবে রাখতে হয়। এর মধ্যে কিছু অংশ নগদে রাখতে হয়, কিছু অংশ বিভিন্ন বন্ড বা ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোতে নগদ অর্থের সংকট এতই প্রকট যে, তারা চাহিদা অনুযায়ী নগদ জমা বা সিআরআরের অর্থ রাখতেও পারছে না। এই খাতে বর্তমানে ১১ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত উদ্বৃত্ত ছিল ১৬ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই খাতে ঘাটতি সহ্য করে না; ঘাটতি হলে জরিমানা আরোপ করা হয়। জরিমানা মওকুফ করতে হলে ব্যাংকের পর্ষদে আবেদন করতে হয়। অন্য খাতের জরিমানা মওকুফ করলেও সাধারণত এই খাতের জরিমানা মওকুফ করা হয় না।