ইনডেক্স অ্যাগ্রোর এমডিকে নামমাত্র জরিমানা

জালিয়াতি ও অনিয়ম

দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইনডেক্স অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গোপন সংশ্লিষ্ট পক্ষ (রিলেটেড পার্টি) লেনদেন এবং আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতার অভাব পাওয়ায় কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ তিন শীর্ষ কর্মকর্তাকে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। প্রায় ২ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত বিএসইসির তদন্তে প্রমাণিতি হলেও কোম্পানিটির এমডিকে নামমাত্র ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বিএসইসির মার্চ মাসের এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশন প্রতিবেদনে এই দণ্ডাদেশের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও জরিমানার পরিমাণ

পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএসইসি নিম্নলিখিত কর্মকর্তাদের ওপর জরিমানা আরোপ করেছে:

• মাহিন বিন মাজহার (ব্যবস্থাপনা পরিচালক): তাকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
• ইকবাল আহমেদ (সিএফও): তাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
• আবু জাফর আলী (কোম্পানি সচিব): তাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

তদন্তে উঠে আসা অনিয়মের তথ্য

বিএসইসির একটি বিশেষ পরিদর্শন দল ইনডেক্স অ্যাগ্রোর প্রধান কার্যালয়সহ চারটি কারখানায় সরেজমিনে তদন্ত চালায়। তাদের প্রতিবেদনে প্রধানত দুটি বড় ধরনের আইন লঙ্ঘনের বিষয় উঠে এসেছে:

গোপন লেনদেন: কোম্পানিটি তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ইনডেক্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’-এর সাথে প্রায় ২ কোটি টাকার লেনদেন করেছে। নিয়ম অনুযায়ী, এমন লেনদেন বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হলেও ইনডেক্স অ্যাগ্রো তা করেনি।

স্বার্থের সংঘাত: তদন্তে দেখা যায়, ইনডেক্স অ্যাগ্রোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক উভয়ই ইনডেক্স কনস্ট্রাকশনের পরিচালনা পর্ষদে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘রিলেটেড পার্টি’ লেনদেন, যা বিনিয়োগকারীদের জানানো জরুরি ছিল।

বিএসইসির পর্যবেক্ষণ

নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, এ ধরনের তথ্য গোপন করা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভ্রান্তিকর এবং এটি সিকিউরিটিজ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া কোম্পানির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো এবং হিসাব রক্ষণেও বেশ কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। শুনানিতে কর্মকর্তাদের দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় কমিশন এই জরিমানার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। বিএসইসির মার্চ মাসের এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইনডেক্স অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজে গোপন সংশ্লিষ্ট পক্ষের (রিলেটেড পার্টি) লেনদেন এবং অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থায় বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় কোম্পানির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়েছে।

এর মধ্যে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহিন বিন মাজহারকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ইকবাল আহমেদ এবং কোম্পানি সেক্রেটারি আবু জাফর আলীকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। বিএসইসির একটি পরিদর্শন দল কোম্পানিটির কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যালোচনা করতে চারটি কারখানা ও প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করে। এ সময় বিভিন্ন সময়ে কোম্পানির জমা দেওয়া নথি ও রেকর্ডও পরীক্ষা করা হয়, যাতে নিয়ন্ত্রক ও হিসাববিধি মানা হয়েছে কিনা তা যাচাই করা যায়।

পরিদর্শনে দেখা যায়, ইনডেক্স অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ও ইনডেক্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মধ্যে প্রায় ২ কোটি টাকার একটি রিলেটেড পার্টি লেনদেন হয়েছে। তদন্তে আরও জানা যায়, ইনডেক্স অ্যাগ্রোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক উভয়েই ইনডেক্স কনস্ট্রাকশনের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গেও যুক্ত। ফলে আন্তর্জাতিক হিসাবমান (ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড) অনুযায়ী এ ধরনের লেনদেন প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক ছিল। তবে ৩০ জুন ২০২২ সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এই ২ কোটি টাকার লেনদেন প্রকাশ করা হয়নি বলে বিএসইসি জানিয়েছে। ফলে এটি হিসাববিধি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোম্পানিটির নিরীক্ষকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে। বিএসইসির প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান জি কিবরিয়া অ্যান্ড কো তাদের অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল যে ২০২২ অর্থবছরে কোম্পানিটির স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কোনো রিলেটেড পার্টি লেনদেন হয়নি। কিন্তু পরিদর্শনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাওয়ায় নিরীক্ষা প্রতিবেদনের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া নির্মাণ ও সিভিল ওয়ার্ক সংক্রান্ত কিছু কাজের আদেশ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও অনিয়ম পাওয়া গেছে। তদন্তে দেখা যায়, যেসব কাজের আদেশ ইনডেক্স অ্যাগ্রোর অনুমোদিত কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরে জারি হওয়ার কথা ছিল, তার কিছুতে ইনডেক্স কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধিরা স্বাক্ষর করেছেন। পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কিছু কাজের ক্ষেত্রে বিকল্প কোটেশন পাওয়া গেছে যা ইনডেক্স কনস্ট্রাকশনের দেওয়া কোটেশনের চেয়ে বেশি ছিল। এতে প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়া প্রতিযোগিতামূলক নিয়ম মেনে করা হয়েছিল কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।