রাজধানীর বনানীর অভিজাত জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান এনজে ডায়মন্ডস থেকে প্রায় দুই বছর ধরে অভিনব পদ্ধতিতে কোটি টাকার ডায়মন্ড ও স্বর্ণালঙ্কার চুরির অভিযোগ উঠেছে দুই নারী কর্মীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা আসল গয়নার পরিবর্তে ভারত থেকে আনা হুবহু দেখতে নকল গয়না রেখে দিতেন, ফলে দীর্ঘদিন বিষয়টি ধরা পড়েনি। সম্প্রতি নিয়মিত ইনভেন্টরি যাচাইয়ে একটি নকল ডায়মন্ড শনাক্ত হলে পুরো শোরুম পরীক্ষা করা হয় এবং তখনই প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে কর্মী মুনমুন আচার্য্য (প্রিয়া) ও মোসাম্মৎ রিফা তামান্নাকে শনাক্ত করা হয়।
এ ঘটনায় বনানী থানায় প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা মামলা করেছেন। মামলায় দুই কর্মীসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগে ২০ ধরনের ডায়মন্ড ও স্বর্ণালঙ্কার এবং প্রায় সাত লাখ টাকা নগদ চুরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চুরি হওয়া গয়নার বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের সময় আসল গয়নার পরিবর্তে রাখা ৫৯টি নকল ডায়মন্ড ও স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনে সরিয়ে নেওয়া আসল গয়নার কোনো হদিস এখনো মেলেনি।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত সময়ে দুই কর্মী যোগসাজশে ধাপে ধাপে আসল ডায়মন্ড ও স্বর্ণালঙ্কার সরিয়ে ফেলেন। পরে সেগুলোর জায়গায় ভারত থেকে অবৈধভাবে আনা উচ্চমানের নকল গয়না প্রতিস্থাপন করেন। নকল গয়নাগুলো এতটাই নিখুঁত ছিল যে সাধারণ পর্যবেক্ষণে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা করে জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত হয় প্রতিষ্ঠানটি।
মামলার বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৯ জুলাই বনানী শাখায় নিয়মিত স্টক যাচাইয়ের সময় প্রথম একটি নকল ডায়মন্ড শনাক্ত হয়। এরপর পুরো শোরুমের গয়না পরীক্ষা করে বড় ধরনের আত্মসাতের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ১০ কোটি টাকার গয়না আত্মসাৎ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাদীর দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা ভারত থেকে আনা নকল গয়না দিয়ে আসল গয়না সরানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন। উদ্ধার হওয়া নকল গয়নার মধ্যে রয়েছে ডায়মন্ড সদৃশ চেইন, গোল্ড-প্লেটেড চুড়ি, সাদা ও রঙিন পাথরের আংটি এবং ডায়মন্ড ও রুবি খচিত বলে মনে হয় এমন ইমিটেশন কানের দুল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, চুরি হওয়া আসল ডায়মন্ড ইতোমধ্যে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কর্মী হওয়ায় মালিকপক্ষের আস্থার সুযোগ নিয়েই এ জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বনানী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘আসামিদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।’ ভারতীয় চক্রের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুই আসামির পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। তারা কতবার বিদেশে গেছেন, সে তথ্য জানতে আদালতের মাধ্যমে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি এ ঘটনায় আর কারা জড়িত, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আসামিদের বাসায় তল্লাশির সময় একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এর তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে মামলার বাদী মো. খায়েজ আহম্মেদ অভিযোগ করেন, প্রধান দুই আসামি গ্রেপ্তার হলেও তাদের সহযোগীদের ধরতে পুলিশের তৎপরতা যথেষ্ট ছিল না। তার দাবি, মামলা দায়েরের পর প্রথম দুই-তিন দিন কোনো অভিযান চালানো হয়নি, ফলে এ সময় চুরি হওয়া মালামাল সরিয়ে ফেলার সুযোগ তৈরি হয়। তিনি আরও জানান, আসামি মুনমুন আচার্য্যের স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের অনুরোধ করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে তারা পুলিশকে সহযোগিতা করছেন বলেও উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
