দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিএটিবির আয় কমেছে ৮১%

ঢাকার কারখানা বন্ধ এবং পণ্যের বিক্রি কমে যাওয়ার প্রভাবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের (বিএটিবিসি) মুনাফা দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ৮১ শতাংশ কমে গেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ মুনাফা কমেছে। কোম্পানির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোববার (২৭ জুলাই) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ডিএসই জানিয়েছে, কোম্পানিটির দেওয়া তথ্যানুসারে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ১ টাকা ৮০ পয়সা। আগের বছরের একই প্রান্তিকে যা ছিল ৯ টাকা ৪৮ পয়সা। ১৯৭৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর এক প্রান্তিকে এত কম মুনাফা এর আগে কখনো দেখেনি কোম্পানিটি। দ্বিতীয় প্রান্তিকে মুনাফায় বড় পতনের প্রভাব পড়েছে অর্ধবার্ষিক হিসাবেও। জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে বিএটিবিসির শেয়ারপ্রতি মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭ টাকা ৬৯ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৭ টাকা ১৪ পয়সা।

বিক্রি কমে যাওয়া এবং ঢাকার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে মুনাফায় এমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানির কর্তৃপক্ষ। এদিকে, গত ১৪ মে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)-এর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়, মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে বিএটিবিসির তামাক কারখানা অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে। এরপর, ১ জুলাই থেকে ঢাকার মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই দিনে কোম্পানিটি ঢাকার কারখানা বন্ধের পাশাপাশি নিবন্ধিত অফিসের ঠিকানাও পরিবর্তন করে। নতুন ঠিকানা নির্ধারণ করা হয়েছে আশুলিয়ার দেওড়া, ধামসোনা, বলিভদ্র বাজার।

ডানহিল, লাকি স্ট্রাইক, কেন্ট, পলমল, কুল, বেনসন এবং রথম্যান্সসহ বিভিন্ন তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তামাক কোম্পানি। বিশ্বজুড়ে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলা এই কোম্পানি বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়ভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।

১৯৭৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটিবিসি) মোট শেয়ার সংখ্যা ৫৪ কোটি। এর মধ্যে ৭২ দশমিক ৯১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১৪ দশমিক ১১ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ার।

গত ১৪ মে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) সরকারের কাছে একটি বিবৃতিতে দাবি জানায়, ঢাকার মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকায় অবস্থিত বিএটিবিসির তামাক কারখানা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৬৫ সালে যখন এ কারখানা স্থাপন করা হয়, তখন মহাখালী ছিল একটি গ্রামীণ জনপদ—যা মূল শহরের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

ক্রমশ মহাখালী ডিওএইচএস এলাকা ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও মিশ্র-আবাসিক এলাকায় পরিণত হয়েছে। এখানে হাজার হাজার পরিবার, শিশু ও বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী কয়েক লাখ মানুষ বসবাস করে। এছাড়াও এ এলাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শিশু পড়াশোনা করে। তবে বিএটিবিসির তামাক কারখানা থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ বাতাস দূষিত করছে এবং এর ফলে শিশুদের শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে—বিবৃতিতে এ অভিযোগ উঠেছে।

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তামাক পাতা আনা-নেওয়া এবং উৎপাদিত তামাক পণ্য সারাদেশে পরিবহনের জন্য বড় বড় ট্রাক ও লরি এলাকায় প্রবেশ করায় সড়কে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। আবাসিক এলাকায় এ ধরনের ভারি যানবাহন শিশুদের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি যানজট, শব্দ ও বায়ুদূষণও বেড়েছে।

তামাক কারখানার মতো ক্ষতিকর একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকায় এখনও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খতিয়ে দেখার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে ওই বিবৃতিতে। সেখানে বলা হয়েছে, এ কারখানা কীভাবে পরিবেশ ছাড়পত্র ও অন্যান্য অনুমতি পায়, সেটি তদন্ত করা প্রয়োজন। ২০২৩ সালে তামাক কোম্পানির প্রভাবেই ‘পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা’ সংশোধন করে তামাক সংশ্লিষ্ট শিল্পকে লাল শ্রেণির পরিবর্তে কমলা শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং তামাক চাষে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। তাই তামাক কোম্পানি ও তাদের অনৈতিক কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশ শহরের মাঝখান থেকে ক্ষতিকর তামাক কারখানাগুলো সরিয়ে সেখানে স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ, তামাক কোম্পানির একচেটিয়া মালিকানায় ব্যাংককের ২০০ একর জমির একটি প্লট বেঞ্জাকিট্টি ফরেস্ট পার্কে রূপান্তর করা হয়েছে, যা বর্তমানে একটি পাবলিক পার্ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯২৭ সালে নির্মিত গ্রিসের এথেন্সের একটি তামাক কারখানা এবং সুলায়মানিয়া, কুর্দিস্তানের আরেকটি তামাক কারখানা বর্তমানে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া, মেলবোর্নের ৫.৩ হেক্টর এলাকায় অবস্থিত মরিস মুর তামাক কারখানাটি এখন ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি ব্যবসায়িক পার্কে পরিণত হয়েছে।

**মহাখালী থেকে সরছে বিএটিবির প্রধান কার্যালয়
**বিএটিবিকে ছাড়তে হবে মহাখালীর প্রধান কার্যালয়
**বিএটিবির এমডিসহ চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা
**বিএটিবি শ্রমিকদের ২২ দফা দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি
**বিএটির কারখানাকে দোকান হিসেবে লাইসেন্স
**বিএটি চার অর্থবছরে ফাঁকি দিয়েছে ৩৭৯ কোটি টাকা
**‘বিএটির’ ছয় কারখানা অনুমোদনহীন, কর্মপরিবেশ নেই
**বিএটিতে শ্রমিকের শ্রম আছে, অধিকার নেই
**বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করতে বিএটি-স্বপ্নর চুক্তি!
**রাজস্বের ২১০.৮৬ কোটি টাকা ‘বিএটির’ পকেটে
**শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে ‘বিএটির’ লোক দেখানো অনুদান
**বিএটির পকেটে রাজস্বের ৫০০ কোটি টাকা!
**খুচরা বিক্রেতার ‘লাভ’ বিএটির পকেটে
**বেশি দামে সিগারেট বিক্রিতে ফাঁকি ৩৭৮৪ কোটি টাকা

This will close in 5 seconds