সারা দেশে শীর্ষ চাঁদাবাজ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ৬৫১ জন, যার মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে ৩২৪ জন। এদের একটি বড় অংশ চাঁদাবাজির পাশাপাশি মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে জানা গেছে। তবে বিস্ময়কর তথ্য হলো, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুত করা খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্তদের প্রায় অর্ধেকই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সক্রিয় এসব চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে শিগগিরই সমন্বিত অভিযান শুরু করা হবে। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এ অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। বিভিন্ন সংস্থার তালিকা একত্র করার পর এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
৪ মার্চ ডিএমপি সদর দপ্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, চাঁদাবাজ ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রণয়ন করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অচিরেই রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশজুড়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে পুলিশকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চূড়ান্ত তালিকায় যাদের নাম থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হবে। শুরুতেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে তাদের, যাদের নাম একাধিক সংস্থার তালিকায় রয়েছে। প্রভাবশালী চাঁদাবাজদের ধরতে অভিযানে সেনাবাহিনীর সহায়তাও নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
র্যাব সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে চাঁদাবাজ মাফিয়ার সংখ্যা অন্তত ৬৫১ জন, যার মধ্যে ব্যাটালিয়নভিত্তিক তালিকায় র্যাব-১১ এলাকায় সর্বোচ্চ ১১০ জনের নাম রয়েছে; এছাড়া র্যাব-১২-এ ৬৩ জন, র্যাব-১-এ ৬১ জন, র্যাব-৬-এ ৫৯ জন, র্যাব-৭-এ ৫২ জন এবং র্যাব-৪-এ ৪২ জন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, পাশাপাশি অন্যান্য ব্যাটালিয়নেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চাঁদাবাজ রয়েছে, যা সারা দেশে সংগঠিত এ অপরাধচক্রের বিস্তৃতি নির্দেশ করে; এ বিষয়ে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল ইফতেখার আহমেদ বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাহিনীর প্রতিটি সদস্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তারা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি র্যাব অপরাধীদের কোনো ভিন্ন পরিচয়ে বিবেচনা করে না।
জানা গেছে, তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন, বাসস্ট্যান্ড, মহাসড়ক ও লঞ্চঘাটে টোলের নামে, হাওড়া এলাকায় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে নানা কায়দায় চাদাবাজি করে আসছে। থানা পুলিশ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), গোয়েন্দা পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)-এর বিভিন্ন ইউনিটসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা পৃথকভাবে তালিকা প্রস্তুত করছে। ইতোমধ্যে এসব তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া শুরু হয়েছে। সব তালিকা যাচাইবাছাই করে একটি সমন্বিত চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ডিএমপি সূত্র জানিয়েছে, অতীতে চাঁদাবাজদের সঙ্গে থানা পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশের অভিযোগ থাকায় শুধু থানা পর্যায়ের তালিকার ওপর নির্ভর করা হচ্ছে না। এজন্য ডিএমপির ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন (আইআইডি) ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) আলাদাভাবে তালিকা করছে। পাশাপাশি এসবি ও অন্যান্য সংস্থার তালিকাও যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে কোনো চাঁদাবাজ বাদ না পড়ে।
ডিএমপির ক্রাইম বিভাগের তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০ থানায় অন্তত ৩২৪ জন চাঁদাবাজ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে তেজগাঁও বিভাগে সর্বোচ্চ ১২৭ জন, মিরপুরে ৪২, গুলশানে ৩৯, উত্তরায় ৪১, ওয়ারীতে ২১, মতিঝিলে ১১, লালবাগে ২৪ এবং রমনা বিভাগে ১৯ জন রয়েছে। থানাভিত্তিক হিসেবে তেজগাঁও এলাকায় সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজ সক্রিয়। কারওয়ান বাজার, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন স্পটে প্রায় ৪০ জন চাঁদাবাজের দৌরাত্ম্য রয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর এলাকায় ৩১ জন, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে ৩০ জন এবং মিরপুরের দারুসসালাম এলাকায় ২৬ জন চাঁদাবাজ সক্রিয় রয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীকে দলীয় বিবেচনায় এড়িয়ে গেলে কখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। অপরাধীদের অনেকেই তাদের দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে। বিষয়টি দলীয় প্রধানের নজরে আনা উচিত আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন জানিয়েছেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ডিএমপি এবং তালিকা প্রস্তুতের কাজ শেষ হলে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সারা দেশে চাঁদাবাজি বর্তমানে বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠেছে, এ বিষয়ে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে এবং অপরাধী যে-ই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজির একাধিক ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে; দিনাজপুর, পটুয়াখালী ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদা না দেওয়ায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে রাজধানীতেও চাঁদাবাজ চক্রের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বসিলা এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগে ‘কালা ফারুক’ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
জামিন নিয়ে ক্ষোভ
চাঁদাবাজ ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দ্রুত জামিনে বের হয়ে যাওয়ায় পুলিশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ১২ মার্চ ডিএমপি সদর দপ্তরে মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে আসে। সভায় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, গ্রেপ্তারের পরপরই অনেক আসামি জামিন পেয়ে যাচ্ছে এবং পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। এক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, ‘চাঁদাবাজি ও মাদক মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা খুব দ্রুত জামিন পেয়ে যাচ্ছে। এতে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং অপরাধ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’
