দেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৩৩ লাখ ৬০ হাজার বজ্রপাত ঘটে, যার ফলে অন্তত ৩৫০ জন মানুষের প্রাণহানি হয়। রোববার রাজধানীর খামারবাড়িতে আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই তথ্য জানানো হয়। রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের (রাইমস) আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ খান মো. গোলাম রাব্বানি জানান, সুনামগঞ্জ ও সিলেট বজ্রপাতের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জেলার মধ্যে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সাধারণত এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রপাতের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে।
বজ্রপাতে প্রাণহানি রোধে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন বা সিপিআর দিলে অনেক ক্ষেত্রে জীবন রক্ষা করা সম্ভব। তিনি বলেন, বজ্রপাতের সময় মানুষকে ঘরের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয় নিতে হবে, বড় গাছের নিচে অবস্থান করা যাবে না এবং খোলা মাঠে আটকা পড়লে দলবদ্ধভাবে না থেকে পরস্পর থেকে দূরে অবস্থান করতে হবে। ঘরের ভেতরে মোবাইল ফোন বা অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহার করা গেলেও বজ্রঝড়ের সময় বৈদ্যুতিক সকেটে সংযুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা উচিত।
রাইমস, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি), ইউনিসেফ, ব্র্যাক এবং সেভ দ্য চিলড্রেন যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রাইমস আলোচনার মূল বিষয়গুলো তুলে ধরে। এর আগে দেশব্যাপী আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবসও পালিত হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটির উদ্বোধন করেন। এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল— ‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বজ্রপাত পূর্ব সতর্কতা ব্যবস্থার উন্নয়ন, সময়মতো সতর্ক বার্তা প্রেরণ নিশ্চিতকরণ এবং সারাদেশে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিই ছিল এই অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। অনুষ্ঠানে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এস. এম. কামরুল হাসান বলেন, রাইমসের কারিগরি সহায়তায় আবহাওয়া অধিদপ্তর ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাতের সতর্কবার্তা প্রচার শুরু করেছে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে এক থেকে ছয় ঘণ্টা আগে বজ্রপাতের সতর্কবার্তা ও করণীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট, ফেইবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করার কথা বলেন তিনি। তিনি বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাসে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার জন্য একটি অভিন্ন সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার সুপারিশ করেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বাংলাদেশকে ‘বহুমাত্রিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ’ হিসেবে তুলে ধরে ভূমিকম্প ও বজ্রপাতকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে ‘মাঠ থেকে কণ্ঠস্বর’ শীর্ষক একটি আলোচনা পর্ব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সুনামগঞ্জের মো. এমদাদ হোসেন, আরেফিন রেজা, ফোরকুন উদ্দিন, সন্ধ্যা রানী দাস ও সাগরিকা অংশ নেন। তারা প্রত্যেকে বজ্রপাতের কারণে প্রিয়জন হারানোর অভিজ্ঞতা কিংবা নিজে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, বজ্রপাত তাদের দৈনন্দিন জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে কীভাবে প্রভাব ফেলে। তারা আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী বিদ্যালয়ের ছুটির সময় নির্ধারণ, নৌযান চলাচল সমন্বয়, নৌকায় লাইফ জ্যাকেট রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং বৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের ভেতরে নিরাপদে রাখার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
