দেশজুড়ে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার নীরবভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। এমন কোনো খাবার খুঁজে পাওয়া মুশকিল যা নিশ্চিতভাবে ভেজালমুক্ত। চাল, ডাল, আটা, মসলা, কলা, দুধ, মিষ্টিসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। ফলপূর্বক এবং মাঠপর্যায়ের কৃষিপণ্যে ব্যবহৃত বিষাক্ত কেমিক্যালও মানুষের পেটে পৌঁছাচ্ছে। শিশুখাদ্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল উপাদান পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দেশের ১৭ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে, ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিল রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনসহ দায়িত্বরত দপ্তরগুলো কার্যকর নজরদারি করছে না। তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং তদারকির অভাবের কারণে ভেজালকারীদের দৌরাত্ম্য দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ মানুষ জানতে চায়, কখন প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকায় থেকে জনস্বার্থ রক্ষা করবে এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, কারণ যেখানে নজর নেই, সেখানে ভেজাল ও রাসায়নিক খাদ্যপণ্যের ছড়াছড়ি অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) এক গবেষণায়ও এ বিষয়ে উঠে এসেছে আতঙ্কিত হওয়ার মতো সব তথ্য। দেখা গেছে সারা দেশ থেকে সংগৃহীত খাদ্য নমুনার ৫২ শতাংশ দূষিত। প্রতিষ্ঠানটির ল্যাবে ৮২টি খাদ্যপণ্য পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান পাওয়া গেছে। এছাড়া ৩৫ শতাংশ ফল ও ৫০ শতাংশ শাকসবজির নমুনায় বিভিন্ন কীটনাশকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। চালের ১৩টি নমুনায় পাওয়া গেছে অতিমাত্রায় বিষাক্ত আর্সেনিক, পাঁচটিতে ক্রোমিয়াম। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসা ও অন্যান্য ভারী ধাতু, আর লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০-৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। এমনকি মুরগি এবং মাছেও মিলছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন জানান, খাদ্যে বিষ ও ভেজাল রোধে সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ প্রণয়ন করেছে। এছাড়া ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনেও খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার ও বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা রয়েছে। তবে এই সব আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় সাধারণ জনগণ কার্যকর সুরক্ষা পাচ্ছে না। তিনি বলেন, কোনো সরকারের আমলেই খাদ্যে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কখনো কখনো লোক দেখানো অভিযানে সরকারের সংস্থা মাত্র তৎপর হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেই। অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে কঠোর পদক্ষেপে জনগণকে রক্ষা করা সম্ভব।
গত বছর হাইকোর্টের নির্দেশে লবণ, হলুদ, গুঁড়া মরিচ, কারি পাউডার, সরিষার তেল, বোতলজাত পানি, মাখন, আটা, ময়দা, নুডলস ও বিস্কুটের ৪০৬টি নমুনা পরীক্ষা করে আদালতে বিএসটিআই প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৪৬টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ৭৪টি পণ্য নিম্নমানের। আদালত এসব পণ্য বাজার থেকে সরানো এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশ দেন। এছাড়া বিএসটিআই ও ক্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাজারের ৮৫ শতাংশ মাছে ফরমালিন মেশানো হয়। ফল পাকাতে ব্যবহার করা হয় কার্বাইড, ইথোফেন ও ফরমালিন।
সরকারি গবেষণা সংস্থা জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, মাত্র এক বছরে মানহীন খাদ্যপণ্যের সংখ্যা ৮১ থেকে বেড়ে ১৯৯-এ পৌঁছেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন, ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। সবকিছু চোখের সামনেই হচ্ছে। অথচ প্রতিকার নেই। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি রোগ। এটি শুধু স্বাস্থ্য নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্য হুমকি। তিনি আরও বলেন, আইন থাকলেও প্রয়োগ কম। একাধিক কর্তৃপক্ষ নামমাত্র অভিযান চালালেও কঠোর শাস্তির অভাবে ভেজাল রোধ করা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে দেশের জনস্বাস্থ্য এক সময় বিপন্ন হয়ে পড়বে।
বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পণ্য ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের নিত্যনতুন কৌশলের কাছে অনেক সময় হেরে যেতে হয়। এ অবস্থা উত্তরণে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল বলেন, প্রতিদিন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এই অভিযানে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য বিক্রির দায়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। জনস্বার্থে এই অভিযান চলমান থাকবে।

