দুই বছরে ৭১৪ হেক্টর আমবাগান উজাড়

রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘা উপজেলা আমের কারণে দেশজুড়ে পরিচিত। রাজশাহী আমের জন্য বিখ্যাত হলেও জেলার মোট ১৭ হাজার ৯৪৩ হেক্টর আমবাগানের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ২১৮ হেক্টরই এই দুই উপজেলায়—অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ। দেশের সেরা আম, উন্নত জাত ও মানসম্পন্ন বাগানের বড় অংশই এখানেই। তবে কয়েক বছর ধরে চাষিরা নানা সংকটে পড়ছেন। আমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি কমে যাওয়া এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব চাষিদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর বিপরীতে নওগাঁ, সাতক্ষীরা ও রংপুরসহ অন্যান্য জেলায় আমের বাজার ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে অনেক চাষি আমচাষ থেকে সরে যাচ্ছেন। সরকারি হিসাবে শুধু চারঘাট ও বাঘায় গত দুই বছরে ৭১৪ হেক্টর আমবাগান কেটে ফেলা হয়েছে। এই পরিস্থিতি রাজশাহীর আমনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

বাঘা উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে এখানে ৫১০ হেক্টর জমির আমবাগান উজাড় হয়েছে। চারঘাট উপজেলায় কাটা পড়েছে আরও ২০৪ হেক্টর। তবে স্থানীয় চাষিদের দাবি, এই দুই উপজেলায় মোট কাটা আমবাগানের পরিমাণ কৃষি বিভাগের হিসাবের দ্বিগুণ—অন্তত এক হাজার হেক্টর।

সম্প্রতি চারঘাটের বাসুদেবপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সাড়ে সাত বিঘা জমির একটি বড় ও পুরোনো আমবাগান দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কাটা হচ্ছে। বাগানের মালিক ইমরান আলী জানান, কয়েক মৌসুম ধরে বাগানে ঠিকমতো আম আসে না; এলেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। তাই তিনি সাড়ে সাত বিঘা জমি প্রতি বিঘা বছরে ৩০ হাজার টাকা হিসেবে ১০ বছরের জন্য লিজ দিয়েছেন। লিজগ্রহীতা সেখানে পেয়ারা, বরই ও ড্রাগন ফল চাষ করবেন। আর মালিক হিসেবে ইমরান আলী বছরে দুই লাখ ২৫ হাজার টাকা হাতেই পাবেন। এই কারণেই তিনি আমবাগান কেটে দিয়েছেন।

চারঘাটের রাওথা গ্রামের আমচাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, আমার সাড়ে তিন বিঘা জমির পুরোটাই আমবাগান। এ বছর আম বিক্রি করেছি ২৮ হাজার টাকার। কিন্তু বছরজুড়ে আমের পরিচর্যাসহ খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এ জমিতে অন্য ফসল করলেও খেয়েপরে বেঁচে থাকতে পারতাম, কিন্তু আম চাষ করে কীটনাশকের দোকানের বকেয়া পরিশোধ করতে পারিনি। এ অবস্থায় তিনি এ বছর বাগান কেটে ফেলে গাছ বিক্রির টাকায় বকেয়া শোধ করে অন্য ফসল আবাদ করছেন।

আমচাষিরা জানান, যে জমিতে ১৫ বছরের বেশি বয়সী আমবাগান রয়েছে, সে জমিতে আম ছাড়া অন্য কিছু আবাদের সুযোগ নেই। কিন্তু আমবাগান কেটে ফেললে একই জমিতে সবজি, পেয়ারা, বরই, ড্রাগন, কলা কিংবা ধানচাষ করে চাষিরা বেশি আয় করছেন। কেউ নিজেরা চাষ না করে জমি লিজ দিয়ে দিচ্ছেন। চারঘাট-বাঘা উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, দুই উপজেলার সব এলাকাতেই নির্বিচারে ছোট-বড় আমবাগান কেটে ফেলা হচ্ছে। গাছ কাটতে ন্যূনতম বাধার সম্মুখীনও হচ্ছেন না তারা। বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম, তুলসীপুর, আড়পাড়া, বাজুবাঘা, হরিরামপুর ও বাউসা এলাকায় এবং চারঘাট উপজেলার পরানপুর, রায়পুর, বাসুদেবপুর, নিমপাড়া, শলুয়া ও রাওথা এলাকায় আমবাগান কাটা হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

রপ্তানি কমে যাওয়ায় বাজারে ধস

রাজশাহীর আম আগে মধ্যপ্রাচ্যেও রপ্তানি হতো, কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেই বাজার বন্ধ আছে। গত চার বছরে চারঘাট-বাঘা অঞ্চল থেকে আম রপ্তানি সীমিত থেকেছে শুধু ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ায়। জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪০ দশমিক ১৮ টন আম রপ্তানি হয়ে আসে ৩৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ২১ দশমিক ২৮ টন, মূল্য ১৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৯৬ টনে, আয় হয় ৭ লাখ ২ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আরও কমে ৩ দশমিক ৩২ টনে নেমে আসে, আর অর্থমূল্য দাঁড়ায় ৩ লাখ ২৩ হাজার টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অঞ্চল থেকে আম রপ্তানির কোনো তথ্যই দিতে পারেনি কৃষি বিভাগ।

রাজশাহীর আম একসময় মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হলেও কয়েক বছর ধরে তা বন্ধ। গত চার বছর চারঘাট-বাঘা এলাকা থেকে রপ্তানি হয়েছে শুধু ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ায়। জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৪০ দশমিক ১৮ টন, যার মূল্য ছিল ৩৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা মূল্যের ২১ দশমিক ২৮ টন রপ্তানি হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পরিমাণ কমে রপ্তানি হয় ৯ দশমিক ৯৬ টন, মূল্য ছিল ৭ লাখ ২ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৩২ টন রপ্তানি করে মেলে ৩ লাখ ২৩ হাজার টাকা। ২০২৪-২৫ বছরে এই এলাকা থেকে আম রপ্তানির তথ্য দিতে পারেনি কৃষি বিভাগ।

আমচাষিদের অভিযোগ, গুণগত মান যাচাই, ল্যাব টেস্ট, রপ্তানি প্রটোকল ও পরিবহন সংকটসহ নানা জটিলতার কারণে আম রপ্তানি ক্রমেই কমছে। রপ্তানি কমে গেলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বেড়ে যায়, ফলে ভালো মানের আমের দামও পাইকাররা কমিয়ে দেন। এ অবস্থায় রপ্তানি খাতকে শক্তিশালী করতে সরকারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই বলেও অভিযোগ চাষিদের। বাঘার মনিগ্রাম এলাকার আমচাষি তারিকুল ইসলাম জানান, রপ্তানির জন্য ফ্রুট ব্যাগিং ছাড়াও আমের আকার ও রং ঠিক রাখতে আলাদা যত্ন নিতে হয়। কিন্তু রপ্তানির উদ্দেশ্যে আম ঢাকার শ্যামপুরের প্যাকিং হাউসে পাঠানোর পর সেখানে বাছাই, তারপর বিমানবন্দরে পাঠাতে অনেক সময় লেগে যায়। ফলে রপ্তানিযোগ্য আমের বড় অংশই নষ্ট হয়ে ফেরত আসে, এতে চাষিদের লোকসান গুনতে হয়। তাই রাজশাহীতে প্যাকিং হাউস স্থাপনসহ পুরো রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানাচ্ছেন চাষিরা।

‘সচেতন করছে’ কৃষি বিভাগ

রাজশাহী অর্গানিক ফুডের পরিচালক ওবাইদুর রহমান বলেন, চারঘাট-বাঘার বাহারি জাতের যে আম বাগান, পর্যায়ক্রমে তা কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে আমরা ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী আম সরবরাহ করতে পারছি না। আমের সঙ্গে এই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। এতে হাজারো শ্রমিক, প্যাকেটিং কর্মী, ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাত সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিউল্লাহ সুলতান বলেন, বাঘায় কাটা পড়া এসব বাগানের অধিকাংশ গাছের বয়স অনেক বেশি, এজন্য ঠিকমতো ফল আসত না। তা ছাড়া পরিকল্পনামাফিক নির্দিষ্ট জাতের আমের বাগান না হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছিলেন না। তাই এসব বাগান কেটে অন্য ফসল আবাদ করছেন, আবার কেউ নতুন জাতের আমবাগানও করছেন। নির্বিচারে যেন গাছ কাটা না হয়, সে বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করছি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, আমের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য জিএপি ও হট-ট্রিটমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণে চাষিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আম চাষ হচ্ছে। আগামীতে রপ্তানি বাড়বে। গাছ কাটলেও চাষিদের নতুন নতুন জাতের বাগান করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।