গত দুই বছরে দেশে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ ও উদ্যোক্তা সংগঠনগুলো। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়াই এসব কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রধান কারণ। এই পরিস্থিতিতে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতাদের মতে, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। শুধু পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। অন্যান্য খাত মিলিয়ে এই সংখ্যা আরও বড় হতে পারে।
শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাবে রপ্তানি আয়ও কমছে। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি আগের অর্থছরের চেয়ে ১ শতাংশের মতো কমেছে। আর রপ্তানি আয় কমেছে আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। পাশাপাশি এই সময়ে নতুন রপ্তানি আদেশ কমেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ উপাত্ত বলছে, গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিপুলসংখ্যক কারখানা বন্ধ থাকা এবং আরও অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা অর্থনীতির জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি আরও বলেন, সরকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করলেও অনেক কারখানার পক্ষে পুনরায় উৎপাদনে ফেরা এখন কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে শুধু অর্থ সহায়তা যথেষ্ট নয়। এসব কারখানার জন্য ‘এক্সিট পলিসি’ গ্রহণ করা যেতে পারে। অন্যদিকে, যেসব কারখানায় প্রণোদনা দিলে উৎপাদন পুনরুদ্ধার সম্ভব, সেগুলোর জন্য পরিচালন পুঁজি সরবরাহ এবং গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দিতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বস্তি দিতে শিল্প এলাকায় ওএমএস কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজন রয়েছে।
কাজ হারিয়েছেন দেড় লাখ শ্রমিক
ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়ন ট্রেড ইউনিয়নের একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম। ১৩০টি দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার মনে করেন, দুই বছরে বন্ধ কারখানার প্রকৃত সংখ্যা ৫০০ নয়, এর দ্বিগুণ হবে। বড় কারখানার বাইরে ছোট কারখানা বন্ধ হলে সরকারি সংস্থা বা বাহিনী তা নথিভুক্ত করে না। তাঁর দাবি, গত দু্ই বছরে শুধু পোশাক খাতেই দেড় লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসা। কিছু কারখানার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা ও সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারা বন্ধ হওয়ার কারণ। আন্তর্জাতিক কারণের মধ্যে রয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলাকে কেন্দ্র করে জ্বালানিসহ বিশ্ববাজারে অস্থিরতা; রাশিয়া, ইউক্রেনের যুদ্ধের অভিঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং এর জেরে বিশ্ববাণিজ্যের ওলট-পালট পরিস্থিতি ও বিশ্ববাজারে নিম্নমুখী চাহিদা।
পরিসংখ্যান কী বলে
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে দেশে মোট ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে, যার মধ্যে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের ১৭০টি এবং অন্যান্য খাতের ২৮৭টি কারখানা রয়েছে। বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ১০৮টি, বিকেএমইএর ৩৫টি, বিটিএমএর আটটি এবং বেপজা অধিভুক্ত ১৯টি কারখানা রয়েছে। তবে এই তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতের সংগঠনগুলোর হিসাবের কিছু অমিল দেখা যায়; বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে তাদের ২২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার মধ্যে গত বছরই সর্বাধিক ১৪১টি এবং ২০২৪ সালে ৭৭টি। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম জোন মিলিয়ে বিজিএমইএর সদস্য কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ১২৭টি।
শিল্পাঞ্চলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট
গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। চাহিদার তুলনায় সাভার ও আশুলিয়ার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর সরবরাহ প্রায় ৪০ শতাংশ কম। ফলে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জেনারেটর চালাতে হয়। সে ক্ষেত্রেও গ্যাস ও ডিজেল চাহিদামতো না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেক কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের ডজন খানেক স্টিল রি-রোলিং মিল এবং সিরামিক কারখানা গ্যাসের চাপ সংকটের কারণে তাদের চুল্লি ঠিকমতো চালু রাখতে পারছে না।
আরও কারখানা ঝুঁকিতে
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বন্ধ হওয়া দুই শতাধিক কারখানার বাইরে আরও দুই শতাধিক কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে। কারখানাগুলো এখন আংশিক সচল। যে কোনো সময় এগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার আগ্রহ দেখানো এই ৪০০ কারখানার সক্ষমতা যাচাইয়ে দুটি অডিট ফার্মকে এরই মধ্যে কাজ দেওয়া হয়েছে। কারখানাগুলো পরিদর্শন করে বিজিএমইএর কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে তারা। অডিট ফার্মগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে বিজিএমইএ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তালিকা দিয়ে ঋণ সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানাবে। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘যদি আমাকে ৫০০ বার প্রশ্ন করেন, শিল্পের জন্য কী চান? প্রতিবারই আমি বলব নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ।’ গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া না গেলে ঋণ সহায়তা দিয়ে শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।’ বিটিএমএ সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনের সদস্য ২৩৪টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। অবশ্য এই হিসাব ২০১৯ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত। বন্ধ কারখানার মধ্যে ১১৪টি স্পিনিং অর্থাৎ সুতা উৎপাদনের কারখানা। বন্ধ থাকা বাকি কারখানাগুলো কাপড় তৈরি, ডায়িং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিংয়ের। বন্ধ হওয়ার পর বিটিএমএর কারখানার সংখ্যা এখন ১ হাজার ৮৬৯টি। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সম্প্রতি জানিয়েছেন, তাঁরই পাঁচটি স্পিনিং মিল বন্ধ রয়েছে।
বিটিএমএ সূত্র জানিয়েছে, কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ১ হাজার ১২১ কারখানায় আংশিক উৎপাদনে রয়েছে। সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক উৎপাদন হচ্ছে কারখানাগুলোতে। বিজিএমইএর এ মুহূর্তে আংশিক সচল কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ৩২১টি। আংশিক চালু কারখানাগুলোর অধিকাংশই বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। আশুলিয়ার লিটিল স্টার স্পিনিং মিল দীর্ঘদিন ধরে সক্ষমতার ৫০ শতাংশ কম উৎপাদন করছে। মিলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম খোরশেদ আলম বলেন, তাঁর কারখানায় গ্যাসের চাপ থাকার কথা ১০ পিএসআইজি। অথচ বেশির ভাগ দিনই ১ বা ২ পিএসআইজির বেশি থাকে না। এ কারণে মেশিন চালু করা যায় না। কোনো রকমে সক্ষমতার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।
রপ্তানি আদেশ কমছে
রপ্তানি আদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝা যায় ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) উপাত্ত থেকে, যা পোশাক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির সনদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং সরকার পক্ষে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ প্রদান করে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ইউডির সংখ্যা ও মূল্য উভয় ক্ষেত্রেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। গত বছরের মার্চে ইউডির সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৬৯৭টি, যার মূল্য প্রায় ২৩৫ কোটি ডলার; এ বছরের মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৪৪১টি এবং মূল্য ২০০ কোটি ডলারের কিছু কম। এপ্রিলে গত বছর ইউডি ছিল ২১ হাজার ৪৮৮টি, যার বিপরীতে পণ্যের মূল্য ছিল ২৩৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার; এ বছর ইউডি বেড়ে ২৭ হাজার ৫১৫টি হলেও মূল্য ২৮৫ কোটি ডলারের কম। মে মাসে গত বছর ইউডি ছিল ২৬ হাজার ৫৪১টি এবং মূল্য ২২৭ কোটি ডলার, যা এ বছর সামান্য কমে ২৬ হাজার ৬৮টি এবং মূল্য ২৫৪ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। জুনে গত বছর ইউডি ছিল ১৮ হাজার ৩৭২টি, যার মূল্য ছিল ২২৭ কোটি ডলারের বেশি; আর চলতি বছরের জুনে তা কমে নেমে এসেছে ১৭৯ কোটি ডলারে।
