শরীয়তপুরে পানের দাম ক্রমেই কমছে। বাজারে দামের পতনে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না চাষিরা, ফলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা। কেউ ধারদেনা করে চাষ ধরে রাখলেও অনেকেই পিছু হটছেন। চাষিদের দাবি, সরকারি প্রণোদনা পেলে আবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যে জানা যায়, শরীয়তপুরের ছয় উপজেলায় ৩১৬ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়, যার বড় অংশ সদর, ভেদরগঞ্জ ও গোসাইরহাট এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে পান আবাদ হয়ে আসছে এবং মাটির উপযোগীতার কারণে এখানকার পান মানেও ভালো। উৎপাদিত পান নৌপথে চাঁদপুর হয়ে নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় যায়। কয়েক বছর আগে এসব পান লন্ডন, সৌদি আরব, দুবাইসহ বিদেশেও রপ্তানি হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রপ্তানি বন্ধ এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় চাষিরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। ফলে কেউ কেউ বরজ ছেড়ে অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার পুঁটিজুড়ি এলাকায় চান চাষি আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার। দীর্ঘ ৩০ বছরের অধিক সময় ধরে করছেন পান চাষ। তার তিনটি বরজে উৎপাদিত পান এরই মধ্যে লন্ডন, সৌদি আরব ও দুবাইতে রপ্তানি করেছেন। তবে কয়েক বছর ধরে পান রপ্তানি না হওয়ার পাশাপাশি দেশের বাজারেও কমেছে কদর। এতে বিপুল অঙ্কের লোকসান গুনছেন এই চাষি। ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন এই চাষি।
রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, শরীয়তপুরে অনেক ভালো মানের পান হয়ে থাকে। আমি কয়েক বছর আগেও বিদেশে পান পাঠিয়েছি। তবে কয়েক বছর ধরে পানের দাম কমে গেছে, আর বিদেশেও পান রপ্তানি হয় না। আমরা খুব বিপদে আছি। ৮ লাখ টাকা খরচ করে তিনটি বরজ করেছি, এরমধ্যে ৪ লাখ টাকাই ঋণ করা। এখন যেই অবস্থা, জায়গা বেঁচে ঋণ শোধ করতে হবে। সরকার যদি আমাদের সার, কীটনাশক আর খইল কেনার ওপর প্রণোদনা দিতো তাহলে এই পান চাষ করা সম্ভব হতো।
জেলার অন্যান্য পান চাষিরাও একই সংকটে পড়েছেন—উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, প্রতিদিনের খরচও উঠছে না। সার, কীটনাশক ও খৈলের দাম বেড়েছে, আর বাজারে পানের চাহিদা কমে গেছে। ফলে হিসাব মেলাতে না পেরে চাষ একসময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই সরকারিভাবে সহযোগিতা চান চাষিরা। পান চাষি মোহাম্মদ হান্নান খাঁ বলেন, ‘পানের বাজার খুব কম, খরচই তুলতে পারতেছি না। এবার পুরো জমানো টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে আর কতদিন চলবে? সামনে তো শ্রমিকও নিতে পারব না। সরকার যদি অন্য ফসলের মতো এই চাষেও সহযোগিতা করত, তাহলে আমরা চাষটা ধরে রাখতে পারতাম।’
পান চাষে কৃষকদের এখন পর্যন্ত কোনো প্রণোদনা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে অচিরেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে চাষিদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস জেলার কৃষি কর্মকর্তার। শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, শরীয়তপুরে যে পান আবাদ হয়, তা খুব ভালো মানের। তবে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত পান চাষিদের জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবো, যাতে তাদের প্রণোদনা দেওয়া হয়। প্রণোদনা পেলে পান চাষ আরও ভালো করা সম্ভব।
