আমের জাতীয় চাহিদার ৪৯ শতাংশ সরবরাহ করে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাগঞ্জ। এ অঞ্চল থেকেই রপ্তানিযোগ্য আমের ৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আম বাগানে থ্রিপস পোকার আক্রমণ নাটোর ছাড়া সামীন্তবর্তী জেলাগুলোর চাষিদের কপালে দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পোকার সংক্রমণে আমের গুণগতমান নষ্টের সঙ্গে ৭০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হয়। গুণগতমান ঠিক না থাকলে আম রপ্তানিযোগ্য থাকে না। ফলে ব্যাপক লোকসান গুনতে হয় চাষিদের। এই লোকসানের পেছনে থ্রিপসকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
থ্রিপস হলো খুব ছোট আকৃতির এক ধরনের কীট, যা প্রধানত আম গাছের ক্ষতি করে। এ জাতীয় কীট দেখতে দেহ লম্বাটে ও সরু এবং রঙ সাধারণত হলুদ, বাদামি বা কালচে; ডানা সরু ও পালকের মতো। গাছের পাতা, ফুল ও কুঁড়িতে থ্রিপস দেখা যায়। এরা গাছের কোষ ছিদ্র করে রস শোষণ করে, যা ফল উৎপাদন ব্যাহত করে। চাষিরা বলছেন, আমের মুকুল আসার পর থেকে গাছে থ্রিপস পোকার আক্রমণ বাড়ে। নিয়মমাফিক স্প্রে ছিটানো হলেও ফের আক্রমণ লক্ষ্য করা যায়। এ জাতীয় পোকা পুরোপুরি নির্মূল করা গেলে আমের উৎপাদন দ্বিগুণ হতে পারে।
দুই যুগের বেশি সময় ধরে আম চাষের সঙ্গে জড়িত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চাষি মো. হাসমত মামুন। এ বছর ৩০৮ বিঘা জমিতে আমের চাষ করেছেন তিনি। ৭ থেকে ৮ হাজার মণ আম উৎপাদনের আশা করলেও সেই আশা গুড়েবালির আশঙ্কা করছেন। গত কয়েক বছর ধরে আম বাগানে থ্রিপস পোকার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, আম চাষ ও উৎপাদনে সবচেয়ে বড় বাধা থ্রিপস পোকা। স্থানীয় চাষিরা একে ‘ওপর পোকা’ নামে ডাকেন। আম গাছে মুকুল থেকে গুটি বের হওয়ার সময় এ পোকার আক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়। এতে প্রায় ৭০ শতাংশ ফলন নষ্ট হয়, ফলে কাঙ্ক্ষিত রপ্তানিযোগ্য আম পাওয়া যায় না এবং লোকসান বাড়ে। তিনি আরও বলেন, ‘শোষক পোকা’ নামের আরেকটি পোকা মুকুলের রস চুষে নেয়, ফলে ফুল ফোটার আগেই মুকুল ঝরে যায়। তীব্র খরা হলে এসব পোকার আক্রমণ আরও বাড়ে। আমের উপরের সবুজ চামড়া নষ্ট হয়ে ফল শফেদার মতো হয়ে যায়। এ ধরনের আম বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হয় না; কেবল রস বা আমসত্ত্ব তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার সদরপুরের চাষি সোহেল রহমান ২০০ বিঘা জমিতে আমের চাষ করেছেন। তিনি বলেন, আম চাষে সবচেয়ে বড় সমস্যা থ্রিপস পোকা। এ পোকার আক্রমণ ঠেকাতে বেশি পরিমাণে ওষুধ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই পোকা ফলনের পাশাপাশি গুণগতমানেও বড় প্রভাব ফেলে। গত বছর এর কারণে প্রায় ৭০ শতাংশ ফলন কমেছে। তিনি জানান, প্রতি লিটার পানিতে ওষুধ প্রয়োগে তিন থেকে পাঁচ টাকা খরচ হয়। তার বাগানে একবার স্প্রে করতে প্রায় ২ লাখ টাকা লাগে এবং মৌসুমে পাঁচ থেকে ছয়বার স্প্রে করতে হয়।
২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেশে আমের বিভিন্ন পোকা-মাকড় এবং বিদেশ থেকে আম আমদানির সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। ‘বাংলাদেশে আমের পোকা-মাকড় ঝুঁকি বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এ গবেষণায় ৫৯ ধরনের পোকা-মাকড় শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি আর্থ্রোপড (৩৪টি কীটপতঙ্গ ও একটি মাইট), ১৯টি রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু এবং পাঁচটি আগাছা রয়েছে। কীটপতঙ্গের তালিকায় থ্রিপসও রয়েছে, যার মধ্যে কালো চা থ্রিপস, মরিচ থ্রিপস এবং মেলন থ্রিপস উল্লেখযোগ্য। তবে গত কয়েক বছরে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে থ্রিপসের আক্রমণ বেশি দেখা গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, ফুল অর্ধেক ফোটার সময় থেকেই থ্রিপসের আক্রমণ শুরু হয় এবং গুটির বয়স ৩ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। গুটি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই নির্দিষ্ট বালাইনাশক প্রয়োগ না করলে ক্ষতি বাড়ে। এসব পোকার আক্রমণে প্রায় ৭০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তিনি আরও জানান, গুটি মটরদানার মতো হলে এক ধরনের পোকা নিচের অংশ খেয়ে ফেলে, ফলে বাদামি দাগ পড়ে—চাষিরা একে ‘উকুন পোকা’ বলেন। এছাড়া ২২ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে ফলছিদ্রকারী পোকা আক্রমণ করতে পারে। এগুলো দমনে নির্দিষ্ট সময়ে বালাইনাশক প্রয়োগ জরুরি। ‘মাতৃ পোকা’ দমনে ফল ঢেকে রাখা, ফাঁদ ব্যবহার এবং নিয়মিত বালাইনাশক প্রয়োগ কার্যকর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে আমের চাষ কিছুটা বেড়েছে। ২০২৫ সালে ২ লাখ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে ২৬ লাখ ৬২ হাজার টন আম উৎপাদন হয়েছে, যার মধ্যে রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ১৯৪ মেট্রিক টন। এর আগের বছর ২ লাখ ৩ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন ছিল ২৪ লাখ ৫০ হাজার টন, রপ্তানি ১ হাজার ৩২১ মেট্রিক টন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানি তুলনামূলক কম। গত ৯ বছরে সর্বনিম্ন রপ্তানি হয়েছিল ২০১৮ সালে—২৩১ টন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত জাত ও মানসম্পন্ন আমের অভাব, রোগবালাই এবং দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়াই রপ্তানির বড় বাধা। আম রপ্তানি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. আরিফুর রহমান জানান, মাঠ পর্যায়ে থ্রিপসসহ বিভিন্ন রোগবালাই দমনে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং রপ্তানি বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
