ত্রিমুখী চাপে বাড়ছে রড-সিমেন্টের মূল্য

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের নির্মাণসামগ্রীর বাজারে। বিশেষ করে রড ও সিমেন্ট খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং দেশীয় বাজারে ডিজেল ও গ্যাস সংকট—এই ত্রিমুখী চাপে পড়েছে খাতটি। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি টন রডের দাম বেড়েছে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। একই সময়ে প্রতি বস্তা সিমেন্টের দামও বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। এতে বাড়ি নির্মাণে আগ্রহী মানুষদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরাও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় এক মাস ধরেই ধীরে ধীরে রড ও সিমেন্টের দাম বাড়ছিল। তবে গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন কোম্পানি হঠাৎ করেই দাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে ট্রাকভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে এসব পণ্যের দাম আরও বেড়ে গেছে।

রড-সিমেন্টের উৎপাদনকারীরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিকবাজারে রড-সিমেন্টের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। ডিজেলের কৃত্রিম সংকটও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। রয়েছে গ্যাসের স্বল্পতাও। এতে উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তাছাড়া ট্রাক সংকটে কারখানা থেকে ডিলার পর্যায়ে রড ও সিমেন্ট পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। তবে ক্রেতা ও আবাসন ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সংকটকে পুঁজি করে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে উৎপাদনকারীরা। সরকারের উচিত উৎপাদন ও কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে খবরদারি করা।

রাজধানীর তেজতুরি বাজারের রড ব্যবসায়ী এস এস করপোরেশনের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবু সুফিয়ান বলেন, এক মাস ধরে রডের দাম পাঁচশ-এক হাজার করে বাড়ছে। তবে যুদ্ধ লাগার পর কোম্পানিগুলো হঠাৎ করে এক সপ্তাহের মধ্যেই টনপ্রতি ছয়-সাত হাজার টাকা বাড়িয়েছে। এছাড়া ডিজেল সংকটের কারণ দেখিয়ে ট্রাকের ভাড়াও বেড়েছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা।

সিমেন্টের বাজারেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর জ্বালানি সংকটের অজুহাতে সিমেন্টের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিমেন্টের প্রতি বস্তায় দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দুই সপ্তাহ আগেও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের একটি বস্তা সিমেন্ট ৪৮০ থেকে ৪৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। বর্তমানে সেটি কিনতে খরচ হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫১০ টাকা। একইভাবে প্রায় সব ধরনের সিমেন্টের দামই বেড়েছে। পূর্ব তেজতুরি বাজারের সিমেন্ট ব্যবসায়ী এবং গুডনেস সাপ্লাই কোম্পানির স্বত্বাধিকারী নুর উদ্দিন আহমেদ বলেন, যুদ্ধের কারণ দেখিয়ে কোম্পানিগুলো সিমেন্টের প্রতি বস্তায় ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ট্রাক মালিকরাও ভাড়া বাড়িয়েছেন। ফলে খুচরা বাজারে সিমেন্টের দাম আরও বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) মহাসচিব ড. সুমন চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বাজারে। গত ১০-১৫ দিনের ব্যবধানে রড উৎপাদনের কাঁচামাল স্ক্র্যাপের প্রতি টনে ৫০ থেকে ৬০ ডলার দর বেড়েছে। বেড়েছে জাহাজভাড়াও। এ ছাড়া দেশে ডিজেলের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে বেড়ে গেছে পরিবহন ভাড়া। অন্যদিকে গ্যাস সরবরাহের স্বল্পতার কারণে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এই যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে দেশে ডিজেলের ব্যাপক সংকট দেখা দিতে পারে। তাতে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিসহ সব কিছুর দাম বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়তে পারে রডের দামে।

সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা জানান, সিমেন্ট তৈরিতে পাঁচ ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়। ক্লিংকার, জিপসাম, স্ল্যাগ, চুনাপাথর ও ফ্লাই অ্যাশ। এগুলোর বেশির ভাগ আমদানিনির্ভর। সবচেয়ে বেশি আমদানি ও ব্যবহৃত হয় ক্লিংকার। চুনাপাথরের সঙ্গে বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে উচ্চতাপে ক্লিংকার তৈরি হয়।

চলমান যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে সিমেন্ট উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের বাজারেও। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) নির্বাহী সদস্য ও ডায়মন্ড সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল খালেক জানান, গত কয়েক দিনে আমদানি পর্যায়ে প্রতি টন ক্লিংকারের দাম ১০ থেকে ১২ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। একইভাবে জিপসাম, স্ল্যাগ, চুনাপাথর ও ফ্লাই অ্যাশের দামও প্রতিটিতে ৮ থেকে ১০ ডলার করে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাস সংকটও বেড়েছে। এর ফলে উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ছে বাজারে পণ্যের দামে।