Header – After

তীব্র শীতে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগ, বেশি আক্রান্ত শিশু

তীব্র শীতের কারণে সারাদেশের হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত, আর বাকি ৩০ শতাংশ রোগী শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণজনিত নানা সমস্যায়—সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গলাব্যথা, টনসিলাইটিস, সাইনোসাইটিস ও ল্যারিঞ্জাইটিসে ভুগছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) শাখার তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে গত শনিবার পর্যন্ত সারাদেশে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৯ হাজার ৪২৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভর্তি রোগীর মধ্যে ৫৫ হাজার ৬৮৩ জন ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে আসেন। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ২৩ হাজার ৭৪৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম–এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও চাঁদপুর—এই ছয় জেলায় ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে নরসিংদীতে—৪ হাজার ১৩৯ জন। এরপর চট্টগ্রামে ১ হাজার ২৯৩ জন, কক্সবাজারে ১ হাজার ১৩৯ জন, সিলেটে ১ হাজার ১৩৪ জন এবং চাঁদপুরে ৭৫৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ডায়রিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সেখানে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৬৫৭ জন। এরপর চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৮৬০ জন, কক্সবাজারে ৩ হাজার ২৮২ জন, নরসিংদীতে ২ হাজার ৩৩৯ জন এবং সিলেটে ২ হাজার ২০৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুরাই শীতকালীন রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জিজনিত জটিলতা শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা গেছে, ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুর ভিড়ে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। এক বছরের মেয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে কেরানীগঞ্জ থেকে হাসপাতালের বহির্বিভাগে এসেছেন মা আকলিমা আক্তার। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ ধরে মেয়ের ঠান্ডা লেগেছে। ওষুধেও সারেনি, তাই এখানে নিয়ে এসেছি।জ্বর, কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত দেড় বছরের ইয়াসিনকে চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরামর্শ দিলেও শয্যা না থাকায় বিপাকে পড়েছেন তার স্বজন। হাসপাতালের বহির্বিভাগে এক ঘণ্টায় অন্তত ২০ শিশুর অভিভাবককে শয্যা না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা যায়। নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি শয্যাও খালি নেই। চিকিৎসক জানান, প্রাথমিক চিকিৎসার পর অনেক শিশুকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, অবস্থার অবনতি হলে ভর্তি করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

হাসপাতালের বহির্বিভাগে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক মাহফুফ হাসান আল মামুন জানান, আসা শিশু রোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশই জ্বর, কাশি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। গুরুতর রোগীদের বেশির ভাগের বয়স এক বছরের কম। রেজিস্ট্রার ডা. সুমাইয়া লিজা বলেন, মোট রোগীর প্রায় ২০ শতাংশের হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন হলেও শয্যা সংকটের কারণে অনেককেই অন্যত্র স্থানান্তর করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট–এর শিশু শ্বাসতন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সরকার বলেন, শীতকালে ফ্লু, সর্দি, কাশি ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এ সময় অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ শীতকালের অধিকাংশ রোগই ভাইরাসজনিত। শিশুর জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, শীত মৌসুমে শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন নেওয়া জরুরি। ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, শ্বাসজনিত ও বাতজনিত রোগের প্রকোপ এ সময় বেড়ে যায়। তিনি বলেন, প্রয়োজন ছাড়া শিশু-বয়স্কদের বাইরে না বের হওয়াই ভালো। বাইরে গেলে অবশ্যই গরম কাপড় পরতে হবে এবং কান, নাক ও মুখ ঢেকে রাখতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ সেবন, হালকা গরম খাবার খাওয়া এবং সুযোগ পেলে রোদে বসার পরামর্শ দেন তিনি।