তিন ব্যাংকের ২৪৩ কোটি টাকা মেরে কানাডায় মঈন

নামমাত্র বন্ধকিতে চট্টগ্রামভিত্তিক পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এম এন নিটওয়্যারকে প্রায় ২৪৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ায় বিপাকে পড়েছে তিনটি বেসরকারি ব্যাংকের স্থানীয় শাখা। দীর্ঘদিনের গ্রাহক হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মো. মঈন উদ্দিন আহমেদের ক্ষেত্রে ঋণ অনুমোদনের সময় শাখা পর্যায়ে ব্যবসার প্রকৃত ও হালনাগাদ আর্থিক অবস্থার যথাযথ যাচাই করা হয়নি। মূলত আস্থার ভিত্তিতেই পৃথকভাবে এই বিপুল অঙ্কের ঋণ মঞ্জুর করা হয়, যা বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর এম এন নিটওয়্যারের ব্যবসা কার্যক্রম কার্যত ভেঙে পড়ে। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়, বন্ধ হয়ে যায় কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম এবং তীব্র আকার ধারণ করে আর্থিক সংকট। অর্থ উদ্ধারে ব্যাংকগুলো তৎপর হলে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের আশ্বাস দেওয়া হয়। সেই অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকার মধ্যেই ব্যাংকগুলোর কাছে আসে দুঃসংবাদ—ঋণ পরিশোধের আগেই গোপনে সপরিবারে দেশ ছেড়েছেন এম এন নিটওয়্যারের কর্ণধার মো. মঈন উদ্দিন আহমেদ। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি গত নভেম্বরেই কানাডায় পাড়ি জমান।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের ইসলামী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকে এম এন নিটওয়্যার নেয় ১১০ কোটি টাকা ঋণ, যার মধ্যে ৭৪ কোটি ইতিমধ্যে শ্রেণিকৃত। এই বিপুল অঙ্কের ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদের মূল্য মাত্র ১৭ কোটি টাকা। একইভাবে, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) আগ্রাবাদ শাখা থেকেও প্রতিষ্ঠানটি ২৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়, কিন্তু এ ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত জামানত রাখা হয়নি। পরবর্তী সময়ে অর্থ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ব্যাংকটি একটি চেক প্রত্যাখ্যান মামলা করেছে।

অন্যদিকে, ওয়ান ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে এম এন নিটওয়্যারের কাছে বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এই ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে মাত্র ১১ শতক জমি, যার বাজারমূল্য সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকার বেশি নয়। ঋণখেলাপি হওয়ার পর ব্যাংকটি ইতোমধ্যে একটি অর্থঋণ মামলা ও পাঁচটি এনআই অ্যাক্ট মামলা (চেক প্রত্যাখ্যান) দায়ের করেছে। এদিকে সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার একটি উচ্চপর্যায়ের টিম নগরীর ঈদগাঁ এলাকায় অবস্থিত এম এন নিটওয়্যারের কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ এবং মূল ফটক তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পায়। সেখানে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতিও পাওয়া যায়নি। একইভাবে কর্ণধার মো. মঈন উদ্দিন আহমেদের বাসভবনও তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক সানা উল্লাহ বলেন, ‘ডিসেম্বরের শেষ দিকে গিয়ে দেখি এম এন নিটওয়্যারের কারখানা ও কর্ণধারের বাড়িতে তালা ঝুলছে। পরে স্থানীয় এলাকাবাসী ও কারখানার সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হই—মঈন উদ্দিন আহমেদ পরিবারসহ কানাডায় পালিয়ে গেছেন। এ বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠানটিতে দেওয়া ঋণ আদায় পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’ তবে দেশের বাইরে থেকেই এম এন নিটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মঈন উদ্দিন আহমেদ হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় বলেন, তিনি দেশত্যাগ করেননি। কেবল ব্যবসায়িক কাজে সপরিবারে বিদেশ সফরে রয়েছেন।’ যদিও দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট তথ্য তিনি দিতে পারেননি।

This will close in 5 seconds