বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক তিন গভর্নর আতিউর রহমান, ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদারসহ ভারতীয় দুই নাগরিক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, হলমার্ক জালিয়াতি, এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ব্যাংক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট তথ্য ও নথি চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েও যথাযথ সাড়া পাচ্ছে না সংস্থাটি। ফলে অনুসন্ধান কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকের উপ-পরিচালক মোমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম এ অনুসন্ধান করছে। টিমের অপর দুই সদস্য হলেন উপপরিচালক রণজিৎ কুমার কর্মকার এবং উপসহকারী পরিচালক ইয়াছিন মোল্লা। অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি গত জুনে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই অনুসন্ধান টিম অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এবং অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে নথিপত্র চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর চিঠি পাঠায়। পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত না আসায় সম্প্রতি ফের চিঠি পাঠিয়েছে অনুসন্ধান টিম।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী, এস এম মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান, আহমেদ জামাল ও আবু ফারাহ মো. নাসের। এছাড়া বিএফআইইউর সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস ও কাজী সায়েদুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক দেবদুলাল রায় ও মেজবাউল হক, পরিচালক তফাজ্জল হুসাইন, অতিরিক্ত পরিচালক মসিউজ্জামান খান ও মাসুম বিল্লাহ এবং উপপরিচালক মসিউজ্জামানও অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন। পাশাপাশি ভারতীয় দুই নাগরিক নীলা ভান্নান ও রাকেশ আস্তানার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। এদের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে সংঘটিত কার্যক্রমের বিভিন্ন তথ্য ও নথিপত্র চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক।
গত বছর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাবেক গভর্নর আতিউরের বিরুদ্ধে জনতা ব্যাংকে অ্যাননটেক্স ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ২৯৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক ২০ ফেব্রুয়ারি মামলা করে। ওই মামলায় তৎকালীন জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবুল বারাকাতকেও আসামি করা হয় এবং পরবর্তীতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আতিউর রহমান ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পাঁচ মাস পর, ১ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের দশম গভর্নর হিসেবে চার বছরের জন্য দায়িত্বভার নেন এবং পরে আরও এক মেয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদে অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সমালোচনার মধ্যে ২০১৬ সালের ২ আগস্ট তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, তিনি ওই বছরের মার্চে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

দুদক অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে— ২০০৯ সালের আগের খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণ সংক্রান্ত নীতিমালার সত্যায়িত ফটোকপি, ২০০৯ সালের পর থেকে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার জন্য জারি করা নীতিমালা এবং ওই নীতিমালা প্রণয়নের পর সুবিধা গ্রহণ করা বেক্সিমকো গ্রুপ, রতনপুর গ্রুপ, কেয়া গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, থার্মেক্স গ্রুপ, শিকদার গ্রুপ, বিবিএস গ্রুপ, আব্দুল মোনেম গ্রুপ, অ্যাননটেক্স গ্রুপসহ যেসব গ্রুপ, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ঋণ নিয়েছেন, তাদের ঋণ কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে এবং শাখার নাম। এছাড়া চাওয়া হয়েছে—একই সঙ্গে গ্রহণ করা ঋণের হিসাবের নাম, স্বত্বাধিকারীর নাম, প্রতিষ্ঠান এবং স্বত্বাধিকারীর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানাসহ গ্রহণকৃত ঋণের পরিমাণ ও বর্তমান অবস্থার তথ্য। এর পাশাপাশি ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের তালিকা, ২০০৯ সালের পর জারি করা ব্যাংক পরিদর্শন সংক্রান্ত নীতিমালার সত্যায়িত ফটোকপি, নীতিমালা প্রণয়ন ও জারির নোটশিটসহ নথিপত্রের সত্যায়িত কপি, হলমার্ক ঋণ জালিয়াতি সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন ও পদক্ষেপের নোটশিটসহ নথি ও পরিপত্র, এবং বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন ও পদক্ষেপের নোটশিট ও পরিপত্রও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আতিউরের সময় অনুমোদন পাওয়া ৯ ব্যাংকের (মেঘনা, মিডল্যান্ড, মধুমতি, এনআরবি, এনআরবি কমার্শিয়াল, এনআরবি গ্লোবাল, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার, ইউনিয়ন ও ফার্মাস ব্যাংক) অনুমোদন সংক্রান্ত নোটশিটের কপি এবং পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংক্রান্ত তথ্য। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের পত্রের প্রেক্ষিতে ঋণ পুনর্গঠন সংক্রান্ত নীতিমালা (২০১৫) প্রণয়নের নোটশিটসহ নথি ও পরিপত্র। রিজার্ভ চুরি সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যায়িত কপি ও সর্বশেষ তথ্য। ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেনা বা মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নোটশিটসহ পরিপত্রের সত্যায়িত কপি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়ে থাকলে সেটির প্রতিবেদনের সত্যায়িত কপি। সাবেক গভর্নর ফজলে কবিরের মেয়াদকালে জারিকৃত সব ঋণ নীতিমালার সত্যায়িত কপি। সুদের হার ৯ শতাংশ সম্পর্কিত সার্কুলার বা নীতিমালার সত্যায়িত কপি। খেলাপি ঋণমুক্ত থাকার পদ্ধতি চালু করার নীতিমালার সত্যায়িত কপি। এ ছাড়া তানভীর দোহার রিজার্ভ চুরিসংক্রান্ত অনুসন্ধানের কপিও চাওয়া হয়।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, এর আগেও এসব তথ্য-উপাত্ত চেয়ে গভর্নর বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা নির্ধারিত সময়ের পরও সেগুলো সরবরাহ করেনি। এ কারণে ফের চিঠি পাঠানো হয়েছে। তথ্য-উপাত্ত না পাওয়ায় অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। আমাদের প্রত্যাশা, এবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমাদের চাওয়া অনুযায়ী তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাবে।
