তামাকে ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন সম্ভব

বাংলাদেশ বর্তমানে রাজস্ব আহরণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে তামাক করনীতি আরও শক্তিশালী করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই তারা ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাকের ওপর কর বাড়ালে সরকারের রাজস্ব কমে যাবে—এমন দাবির পক্ষে কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই। বরং প্রস্তাবিত কর সংস্কার বাস্তবায়ন করা হলে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন সম্ভব, যা জনস্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। তাদের মতে, তামাকের দাম ও কর বৃদ্ধি করা হলে প্রায় চার লাখ কিশোর-কিশোরী শুরুতেই তামাকের আসক্তি থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডির পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) কার্যালয়ে ওরিয়েন্টেশন কর্মশালায় এসব কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা। এ সময় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ও পরিচালক ড. শাফিউন এন শিমুল। প্রধান অতিথি ছিলেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় প্রস্তাবিত কর সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভাব্য অতিরিক্ত রাজস্ব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তার পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেন শাফিউন ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সিগারেটের দাম এখনও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে তামাকজাত পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় এর ব্যবহারও বেশি।সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, দেশের সিগারেট বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম দামের সিগারেটের দখলে রয়েছে। এ কারণে এসব সিগারেটের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তামাকজনিত বিভিন্ন রোগের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা স্বাস্থ্যব্যয় হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাকের ওপর কর বৃদ্ধি করা হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের জন্য তামাকজাত পণ্যের মূল্য ও কর কাঠামোতে সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের ন্যূনতম মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং সিগারেটের সব মূল্যস্তরে সমানভাবে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৪ টাকা নির্দিষ্ট কর আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।

ড. শিমুল তামাক কর নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণা নিয়েও আলোচনা করেন। তিনি বলেন, তামাক কর বাড়ালে সরকারের রাজস্ব কমে যাবে—এমন দাবির পক্ষে শক্ত কোনো প্রমাণ নেই। বরং প্রস্তাবিত কর সংস্কার বাস্তবায়ন হলে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন সম্ভব, যা জনস্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। এছাড়া কর বাড়ানো হলে প্রায় ৪ লাখ কিশোর-কিশোরী তামাকের আসক্তি থেকে শুরুতেই সুরক্ষিত থাকতে পারে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণকে একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক নীতি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। তামাক নিয়ন্ত্রণ মানে কাউকে নিষিদ্ধ করা বা ধূমপায়ীদের শাস্তি দেওয়া নয়; বরং কর, বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ ও বিজ্ঞাপন সীমিতকরণের মতো নীতিগত উপায় ব্যবহার করে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, এটি মূলত সংকীর্ণ মুনাফাকেন্দ্রিক স্বার্থ ও বৃহত্তর জনস্বার্থের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা, যেখানে সমাজকে জনস্বার্থের পক্ষেই দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিতে হবে। তিনি গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় জোর দিয়ে বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ একটি চলমান ধারণা ও বর্ণনার প্রতিযোগিতা। এই প্রক্রিয়ায় শক্তিশালী তথ্য ও পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্য না থাকলে তামাক নিয়ন্ত্রণ লড়াইয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়। করনীতি সরকারের অন্যতম কার্যকর নীতি-উপকরণ, যা একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনশীল খাতের দিকে স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।