ঢাকার অভিজাত এলাকায় লোডশেডিং নেই

বিদ্যুতের ঘাটতি সাধারণত লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়, যার ফলে সারা দেশে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে এর বাইরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার, বিশেষ করে নতুন ঢাকার বাসিন্দারা তুলনামূলকভাবে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছেন এবং সেখানে লোডশেডিং এড়াতে সরকার চেষ্টা করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ২২ এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই দিন দেশের রেকর্ড ঘাটতির সময়েও নতুন ঢাকা ও ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) বিতরণ এলাকায় কোনো লোডশেডিং হয়নি এবং সারা দিন চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত ছিল।

ঢাকার অপর বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) এলাকায়ও ২২ এপ্রিল লোডশেডিং ছিল খুবই কম। সে দিন দুপুর ৩টায় সারা দেশে চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়। সে সময় অর্থাৎ দুপুরে ডিপিডিসির বিতরণ এলাকায় কিছুটা লোডশেডিং হয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় ১ শতাংশেরও কম। আর সারা দেশে ওই সময়ের লোডশেডিংয়ের আধা শতাংশেরও কম।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য মতে, ২২ এপ্রিল দুপুর ৩টায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮৩৭ মেগাওয়াট। সে সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ তথা বিতরণ করা হয় ১২ হাজার ৩৪৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দুপুর ৩টায় লোডশেডিং হয় ২ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট যা মোট চাহিদার ১৬ দশমিক ৮১ শতাংশ। সে সময় ডেসকোর বিতরণ এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪৫২ মেগাওয়াট যার পুরোটাই সরবরাহ কর হয়। একই সময় ডিপিডিসির বিতরণ এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২ হাজার ৪০ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ করা হয় ২ হাজার ২৮ মেগাওয়াট। মাত্র ১২ মেগাওয়াট বা শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি ছিল সে সময় যা লোডশেডিং করা হয়। ঢাকা শহরের বাইরে আর কোথাও এত কম লোডশেডিং করা হয় না। যদিও গতকাল জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের কৃষি খাতে সেচব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে এবং শহর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করতে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গ্রামের কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং তারা যেন পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পায়, সেটি নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এক্ষেত্রে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এদিকে ঢাকা শহরে লোডশেডিং না থাকলেও ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলাগুলোর পরিস্থিতি ভিন্ন। এসব জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), যেখানে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। ২২ এপ্রিল দুপুর ৩টায় ঢাকা বিভাগের বাইরের জেলাগুলোয় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২ হাজার ৫২৭ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ করা হয় ১ হাজার ৯৮১ মেগাওয়াট, ফলে ৫৪৬ মেগাওয়াট বা ২১ দশমিক ৬১ শতাংশ লোডশেডিং দেখা যায়। আরইবি, যা দেশের পৌর এলাকার বাইরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, সারা দেশের সব বিভাগেই দায়িত্ব পালন করে। ওই দিন সংস্থাটির মোট চাহিদা ছিল ৭ হাজার ৯৭৪ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ করা হয় ৫ হাজার ৯৯৫ মেগাওয়াট, ফলে ১ হাজার ৯৭৯ মেগাওয়াট ঘাটতি বা ২৪ দশমিক ৮২ শতাংশ লোডশেডিং হয়।

ঢাকা বিভাগের বাইরে আরইবির এলাকাগুলোর মধ্যে সে সময় সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ময়মনসিংহে ৩১৭ মেগাওয়াট। এছাড়া খুলনা বিভাগে ২৮৭ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ২৪৭, কুমিল্লায় ২৩৪, রংপুরে ১৪৩, চট্টগ্রামে ৯৫, সিলেটে ৬৬ ও বরিশাল বিভাগে ৪৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। এক্ষেত্রে লোডশেডিংয়ের হার ছিল খুলনা বিভাগে ২৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ, রাজশাহীতে ২৪ দশমিক ৩১, কুমিল্লায় ২৩ দশমিক ৮৩, রংপুরে ২৯ দশমিক ৪২, চট্টগ্রামে ২৩ দশমিক ৩৪, সিলেটে ২১ দশমিক ৬৪ ও বরিশাল বিভাগে ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এদিক ঢাকা বাইরে প্রতিটি বিভাগে আরইবির পাশাপাশি অপর আরেকটি করে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা কাজ করে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও সিলেটে বিদ্যুৎ বিতরণ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সংস্থাটির গ্রাহক পর্যায়ে ২২ এপ্রিল দুপুর ৩টায় বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১ হাজার ৮৩০ মেগাওয়াট। তবে সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ৫৮২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ২৪৮ মেগাওয়াট বা ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ লোডশেডিং ছিল। চার বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ঘাটতি ছিল ১১৮ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ২৬, ময়মনসিংহে ৯২ ও সিলেটে ১২ মেগাওয়াট।

উত্তরবঙ্গের দুই বিভাগ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে আরইবির পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ করে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)। দুই বিভাগে সংস্থাটির ২২ এপ্রিল দুপুর ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৮৪৬ মেগাওয়াট। তবে সরবরাহ করা হয় ৭১২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ১৩৪ মেগাওয়াট বা ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ ঘাটতি ছিল। এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগে লোডশেডিং হয় ৭৩ মেগাওয়াট ও রংপুর বিভাগে ৬১ মেগাওয়াট। আরইবির পাশাপাশি খুলনা ও বরিশালে বিদ্যুৎ বিতরণে করে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। দুই বিভাগে সংস্থাটির ২২ এপ্রিল দুপুর ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৬৯৫ মেগাওয়াট। তবে সরবরাহ করা হয় ৫৭৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ১২১ মেগাওয়াট বা ১৭ দশমিক ৪১ শতাংশ ঘাটতি ছিল। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ওই সময় লোডশেডিং হয় ২৯ মেগাওয়াট ও খুলনা বিভাগে ৯২ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ২২ এপ্রিল দুপুর ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ময়মনসিংহ বিভাগে ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এরপরই রয়েছে রংপুর ও খুলনা বিভাগ। এ দুই বিভাগে সে সময় লোডশেডিং ছিল যথাক্রমে চাহিদার ২৬ দশমিক ৫৩ ও ২৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এছাড়া রাজশাহী বিভাগে চাহিদার ২০ দশমিক ২৭, কুমিল্লা অঞ্চলে ১৯ দশমিক ৩৬, চট্টগ্রামে ১৭ দশমিক ৫২, বরিশালে ১৬ দশমিক ৫৫, সিলেটে ১৫ দশমিক ৯৮ ও ঢাকা বিভাগে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ লোডশেডিং হয়।