সুস্থ ও কর্মক্ষম প্রজন্ম গড়ে তুলতে ভিটামিনসমৃদ্ধ ও নিরাপদ ভোজ্যতেলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ড্রামে খোলা তেল বিক্রি, অস্বচ্ছ প্যাকেজিং এবং ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণের অভাব এ লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিএমএ ভবনে আয়োজিত ‘সবার জন্য ভিটামিনসমৃদ্ধ নিরাপদ ভোজ্যতেল: অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়’ শীর্ষক সাংবাদিক কর্মশালায় এসব মতামত তুলে ধরেন বক্তারা। কর্মশালাটি আয়োজন করে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ। এতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অসংখ্য সাংবাদিক অংশ নেন।
কর্মশালায় আলোচক ছিলেন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম ও গবেষণাগার বিভাগের সাবেক পরিচালক (উপসচিব) ফকির মুহাম্মদ মুনাওয়ার হোসেনসহ অনেকে। কর্মশালায় জানানো হয়, খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল বিক্রি সরকারি নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ ২০১১-১২ অনুযায়ী, দেশে প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে একজন ভিটামিন ‘এ’ এবং দুজন ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতিতে ভুগছে। যদিও দেশে ভোজ্যতেল ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন ২০১৩ কার্যকর আছে, বাস্তবে বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ তেলেই পর্যাপ্ত ভিটামিন নেই বা পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় কম। আইসিডিডিআর,বি-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া ভোজ্যতেলের প্রায় ৬৫ শতাংশ ড্রামে বিক্রি হয়। এর মধ্যে ৫৯ শতাংশে ভিটামিন ‘এ’ একেবারেই অনুপস্থিত, আর মাত্র ৭ শতাংশ তেলে নির্ধারিত মাত্রায় ভিটামিন পাওয়া গেছে।
বক্তারা বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই এসব ড্রাম আগে কেমিক্যাল, মবিল বা শিল্পপণ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে, যা নন-ফুড গ্রেড ও বিপজ্জনক। এসব ড্রামে তেলের উৎস বা মান সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকে না, ফলে ভেজাল বা নিম্নমানের তেল সহজেই বাজারে প্রবেশ করছে।’ তারা আরও উল্লেখ করেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২২ সালের জুলাই থেকে খোলা সয়াবিন তেল এবং ডিসেম্বর থেকে খোলা পাম তেল বিক্রি বন্ধ থাকার কথা থাকলেও, বাজারে এখনো ড্রামে তেল বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। তাই নিরাপদ ও ভিটামিনসমৃদ্ধ ভোজ্যতেল নিশ্চিত করতে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদারকি জোরদার করার আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা আরও বলেন, ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি শিশুদের অন্ধত্ব ও মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। আর ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাবে রিকেটস, হাড়ক্ষয়, হৃদরোগসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তাই ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণের পাশাপাশি ‘ডি’ সংযোজন একটি সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন খাবার থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে পারেন। কর্মশালায় আলো প্রতিরোধী ও অস্বচ্ছ বোতলে তেল সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। আলো বা সূর্যালোকের সংস্পর্শে ভিটামিন ‘এ’ দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তেলের গুণগতমান হ্রাস পায়। কর্মশালায় বক্তারা বলেন, ‘গুণগত মানসম্পন্ন তেল পুষ্টি সরবারহের পাশাপাশি স্বাস্থ্যে সুরক্ষাও প্রদান করে। তাই ভোজ্যতেলে নিরাপদ প্যাকেজিং নিশ্চিত করা অপরিহার্য।’

