ডিএসইকে পাত্তাই দিল না তুং হাই

কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, দীর্ঘদিন ধরে লোকসান এবং ঋণাত্মক নিট সম্পদ মূল্য—সব মিলিয়ে আর্থিকভাবে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেড। এর মধ্যেই কোম্পানিটির শেয়ারদরে অস্বাভাবিক উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। বিষয়টি নজরে আসার পর শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণ জানতে কোম্পানিটিকে চিঠি দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। তবে ডিএসইর চিঠির কোনো জবাব দেয়নি কোম্পানিটি।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, গত ২ আগস্ট তুং হাই নিটিংয়ের শেয়ারদর ছিল ২ টাকা ৮০ পয়সা। ২৩ আগস্ট লেনদেন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ১০ পয়সায়। অর্থাৎ মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম বেড়েছে ২ টাকা ৩০ পয়সা বা প্রায় ৮২ শতাংশ। অস্বাভাবিক এই দরবৃদ্ধির পেছনে কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য রয়েছে কি না, তা জানতে চেয়েছিল ডিএসই। তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

উৎপাদন বন্ধ, কারখানায় মরিচা

এর আগে তুং হাই নিটিংয়ের কারখানা পরিদর্শন করে ডিএসইর একটি বিশেষ পরিদর্শক দল। সরেজমিনে গিয়ে তারা কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ দেখতে পায়। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে কারখানাটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। এসব যন্ত্রপাতিতে মরিচা ও ময়লার স্তর জমে থাকার কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। নিয়ম অনুযায়ী, কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিনিয়োগকারীদের জানানো বাধ্যতামূলক। তবে তুং হাই নিটিং এ বিষয়ে যথাযথ তথ্য প্রকাশ করেনি বলেও পরিদর্শনে উঠে আসে।

লোকসানে ডুবছে কোম্পানি

উৎপাদন বন্ধ থাকার পাশাপাশি কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থাও বেশ নাজুক। দীর্ঘদিনের লোকসানের কারণে তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেড বহুদিন ধরে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। সর্বশেষ অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ঋণাত্মক। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৬ টাকা ৩৫ পয়সায়। অর্থাৎ, কোম্পানিটির মোট সম্পদের চেয়ে দায়ের পরিমাণ বেশি। এ ছাড়া কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৭৬ কোটি টাকা। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশও দিতে পারেনি।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশই বেশি

২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং ২০১৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১০৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং মোট শেয়ার ১০ কোটি ৬৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩০ দশমিক ০৪ শতাংশ শেয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বাকি ৬২ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন বন্ধ এবং ঋণাত্মক নিট সম্পদ মূল্যের মতো গুরুতর আর্থিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কোনো কোম্পানির শেয়ারদর এভাবে বাড়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। ব্যবসায়িক ভিত্তি দুর্বল এমন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে যাচাই-বাছাই ছাড়া বিনিয়োগ করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাঁদের মতে, তুং হাই নিটিংয়ের শেয়ারদরের অস্বাভাবিক উত্থানের পেছনে কোনো কারসাজি বা অসাধু চক্র জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি কোম্পানিটির তথ্য প্রকাশে কোনো অনিয়ম বা গোপনীয়তা ছিল কি না, সেটিও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তের আওতায় আনা উচিত।