টোল আদায়ে অনিয়ম, বিপুল রাজস্ব ফাঁকি

ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার

যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান (মেয়র হানিফ) ফ্লাইওভারে আদায় করা টোল থেকে চুক্তি অনুযায়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি) নিয়মিত রাজস্ব দিচ্ছে না পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার। বরং গাড়ির প্রকৃত সংখ্যা গোপন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে টোল আদায়ের বিপুল রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। ২০১৩ সালে ফ্লাইওভার উদ্বোধনের পর টানা সাত বছর নানা অজুহাতে ডিএসসিসিকে কোনো রাজস্বই দেয়নি ওরিয়ন। এ নিয়ে দীর্ঘদিন হাইকোর্টে চলা আরবিট্রেশন মামলার নিষ্পত্তির পর ২০২০ সালে টোল আয়ের ৫ শতাংশ ইক্যুইটি শেয়ার দেওয়ার চুক্তি হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই চুক্তি অনুযায়ীও ডিএসসিসিকে পূর্ণ রাজস্ব পরিশোধ করেনি ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার।

রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে তৎকালীন মেয়র ফজলে নূর তাপস ২০২০ সালের জুলাইয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ফ্লাইওভারে সাতটি টোল প্লাজা স্থাপন করেন। করোনাকালেও সে সময় ফ্লাইওভার দিয়ে প্রতিদিন ৯৪ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচলের তথ্য পাওয়া যায়। ডিএসসিসি সূত্র জানায়, সমীক্ষা অনুযায়ী করপোরেশনের যে পরিমাণ রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল, তার এক-তৃতীয়াংশও তখন দেয়নি ওরিয়ন। পরবর্তী সময়ে একাধিক দেনদরবারের পর ২০২০ সালের পর থেকে মাসে ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও সেটিও নিয়মিত পরিশোধ করা হয়নি। কর্মকর্তারা জানান, ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে যানবাহন চলাচল কয়েক গুণ বেড়েছে। তবে নতুন কোনো সমীক্ষা না হওয়ায় প্রকৃত হিসাব নির্ধারণ করা যাচ্ছে না এবং আগের হিসাব অনুযায়ী প্রাপ্য রাজস্বও নিয়মিত পাচ্ছে না সিটি করপোরেশন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর টানা কয়েক মাস ডিএসসিসিকে কোনো রাজস্বই দেয়নি ওরিয়ন। পরিবর্তিত প্রশাসনের সময়ে ওরিয়নের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও চিঠি চালাচালি হয়। এমনকি মন্ত্রণালয় থেকেও যোগাযোগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত চলতি ফেব্রুয়ারির শুরুতে মাত্র এক মাসের রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাস সময়ে এটিই প্রথম পরিশোধ, যা খুব বেশি অগ্রগতি নয় বলে সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য।

ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (উপসচিব) জোনায়েদ কবীর সোহাগ বলেন,‘ওরিয়নের কাছ থেকে ৫ শতাংশ ইক্যুইটি শেয়ার বাবদ যে রাজস্ব পাওয়ার কথা, তা আমরা ঠিকমতো পাচ্ছি না। রাজস্ব পরিশোধের জন্য একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে, মন্ত্রণালয় থেকেও তাগাদা দেওয়া হয়েছে। ইতিবাচক দিক হলো—গত সপ্তাহে এক মাসের টাকা দিয়েছে ওরিয়ন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এটিই প্রথম পেমেন্ট। বিগত মেয়রের সময়ে মাসিক ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকা পাওয়া গেলেও ৫ আগস্টের পর থেকে ডিএসসিসি বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন,‘গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে ডিএসসিসি যথাযথ মনিটরিংয়ের ঘাটতির কারণে সঠিক রাজস্ব পায়নি। চুক্তি অনুযায়ী যে আলোচনাগুলো হওয়ার কথা ছিল, তা আগে হয়নি। ফলে পাওনার হিসাবেও তথ্যগত বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করছি এবং একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ওরিয়নের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে—তারা গত ৩৫ মাস টাকা দেয়নি, সেই পাওনা আদায়ের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে যাচ্ছে।’

সফটওয়্যারে এক্সেস না থাকায় গাড়ির প্রকৃত সংখ্যা এবং টোলের পরিমাণ জানতে পারছে না ডিএসসিসি। ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী বলেন,‘ওরিয়ন যে যানবাহনের সংখ্যা জানাচ্ছে, সেটি কতটা সঠিক তা যাচাইয়ের জন্য আমরা সফটওয়্যারের পূর্ণ এক্সেস চাইব। চুক্তিতে আগেই এ বিষয়টি উল্লেখ ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা এখন বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছি।’

প্রায় ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারটিতে আটটি প্রবেশ ও ছয়টি বের হওয়ার পথসহ মোট ১৪টি র‍্যাম্প রয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক বুথেই সফটওয়্যারের মাধ্যমে টোল আদায় করা হচ্ছে না। শনিরআখড়া ও ধোলাইপাড় দিকের প্রবেশপথে সিএনজি ও মোটরসাইকেল থেকে হাতে হাতে টাকা নেওয়া হচ্ছে।

এর বিনিময়ে একটি টোকন দেওয়া হলেও টোকনে উল্লেখ করা সময়ের সঙ্গে প্রকৃত সময়ের কোনো মিল পাওয়া যায় না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিদিন সকালে এসব টোকন কর্মীদের হাতে সরবরাহ করা হয় এবং রাতে টোকেনের সংখ্যার ভিত্তিতে আদায়কৃত অর্থ জমা দেওয়া হয়। অথচ প্রতিদিন এই দুটি প্রবেশপথ দিয়ে ১০ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল ও পাঁচ হাজারের বেশি সিএনজি চলাচল করে। সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মূল সফটওয়্যার ব্যবস্থার বাইরে আলাদা লাইনে টোল আদায় হওয়ায় এসব যানবাহনের তথ্য কেন্দ্রীয় সিস্টেমে যুক্ত হচ্ছে না। ফ্লাইওভারের টোল আদায় ও বকেয়া রাজস্ব বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওরিয়ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবায়দুল করিম এবং প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র খালেদ মাসুদকে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

** চুক্তি ছাড়াই ফ্লাইওভার নির্মান করে ওরিয়ন