২০১৭ সালে দেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ও ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে টেলিটকের ৩জি প্রযুক্তি চালু এবং ২.৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্প অনুমোদন দেয় শেখ হাসিনা সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরও বাজারে টেলিটকের অংশীদারিত্ব মাত্র ৩ শতাংশের মধ্যে সীমিত রয়েছে। নেটওয়ার্কের দুর্বলতা ও সেবার মান উন্নত না হওয়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহক সংখ্যা কমছে বলে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে অসন্তোষ বাড়ছে। পাশাপাশি অন্যান্য অপারেটরদের দ্রুত ৪জি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের ফলে টেলিটকের বাজার হারানোর ঝুঁকি আরও বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
জানা গেছে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের আওতায় ২০১৭ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ৭৫৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড (টিবিএল)। প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৭৭৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। প্রকল্পের মূল বাস্তবায়নকাল ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও পরবর্তীকালে তা সংশোধন করে মেয়াদ ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। বাস্তবে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এবং তা শেষ হয় ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত।
এই প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও গ্রাহক পর্যায়ে নেটওয়ার্কের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারেনি টেলিটক, ফলে গ্রাহক অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে এবং বাজার হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি সরকারি পর্যবেক্ষণেও এ বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবে সরাসরি কোনো এক্সিট পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পাশাপাশি প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রেও একাধিক দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মাইলফলক অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার অভাব, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনের অনুপস্থিতি এবং এক্সিট পরিকল্পনা না থাকা—যা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএমইডি জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হওয়ায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিলম্ব হয়েছে, যার ফলে জনগণের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। প্রতিযোগিতামূলক টেলিযোগাযোগ বাজারে অন্যান্য অপারেটরের তুলনায় টেলিটকের অগ্রগতি ধীরগতির হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহক হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এর প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহক সন্তুষ্টির ক্ষেত্রেও অঞ্চলভেদে পার্থক্য দেখা গেছে—কিছু এলাকায় সন্তুষ্টির হার তুলনামূলক বেশি হলেও অন্য কিছু এলাকায় তা কম, যা গ্রাহক ধরে রাখা এবং ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা বজায় রাখাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে।
আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরবর্তী পরিচালনা পর্যায়েও একাধিক ঝুঁকির বিষয় উল্লেখ করেছে। এতে বলা হয়, বাজারে অন্যান্য অপারেটর দ্রুত চতুর্থ প্রজন্ম বা আরও উন্নত সেবা সম্প্রসারণ করলে টেলিটকের গ্রাহক হারানোর ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে, যা প্রতিষ্ঠানের বাজার অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে। একইসঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের সীমাবদ্ধতাকেও একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রযুক্তি স্থানান্তর বা প্রয়োজনীয় হালনাগাদ কার্যক্রমে বাধা থাকলে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। এদিকে মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিপুল ব্যয়ে বাস্তবায়িত ৩জি প্রযুক্তি চালুকরণ ও ২.৫জি সম্প্রসারণ প্রকল্প শেষ হলেও সাধারণ গ্রাহকরা কোনো সুফল পাচ্ছেন না, বরং এটি একটি ব্যর্থ উদ্যোগ যেখানে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, সেবার মান এতটাই নিম্ন যে ভবনের ভেতরে অবস্থান না করলে ঠিকভাবে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এএমটিওবি) সর্বশেষ হিসাব বলছে, দেশে মোট মোবাইল সিম গ্রাহকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৮৬ লাখ। দেশের সরকারি অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের গ্রাহক সংখ্যা বর্তমানে ৬৮ লাখ ১০ হাজার যা মোট বাজারের মাত্র ৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব বহন করছে। দেশের টেলিকম খাতের এই গ্রাহক সংখ্যার বড় একটি অংশ এককভাবে গ্রামীণফোন লিমিটেডের দখলে। মে মাসের শেষ নাগাদ এই অপারেটরটির মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৫৯ লাখে যা দেশের মোট মোবাইল গ্রাহক বাজারের ৪৩ শতাংশ। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা রবি আজিয়াটা লিমিটেডের গ্রাহক সংখ্যা বর্তমানে ৫ কোটি ৮১ লাখ ৮০ হাজার এবং শতাংশের হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি বাজারের ৩১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে, বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস লিমিটেড ৩ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার গ্রাহক নিয়ে বাজারের ২৩ শতাংশ নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশের সরকারি অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের গ্রাহক সংখ্যা বর্তমানে ৬৮ লাখ ১০ হাজার যা মোট বাজারের মাত্র ৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব বহন করছে।
এদিকে গ্রামপর্যায়ে টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ৫জি সেবাদানে নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি একটি প্রকল্পও বাস্তবায়ন হয়েছে। তারপরও গ্রাহক পর্যায়ে নেটওয়ার্কের মান উন্নত করতে পারেনি টেলিটক। ২০২১ সালের ১ জুলাই প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এতে মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ২ হাজার ২০৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয় ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। তিন বছরমেয়াদি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড। পরে ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে দুই দফা মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপর ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্প সমাপ্তির জন্য বাকি ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে বাস্তবায়ন সংস্থা বাংলাদেশ টেলিটক। প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৫৬ শতাংশ। একসঙ্গে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৪৩ শতাংশ। এর মানে খরচ হয়েছে ৯৪৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা। তবে এখন অতিরিক্ত বরাদ্দ না চাওয়া হলেও মেয়াদ বাড়ানোর কারণে ভবিষ্যতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
টেলিটকের লোকসান কমাতে বিদেশি বিনিয়োগ ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দিয়েছেন টেলিকম অ্যান্ড আইসিটি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের (টিআইপিএপি) আহ্বায়ক এবং বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর। তিনি বলেন, টেলিটকের বিদ্যমান লাইসেন্স ও অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে এটিকে কোনো বড় বিদেশি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পরিচালনা করা যেতে পারে। তার মতে, বিদেশি দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয় ছাড়া টেলিটককে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকিয়ে রাখা কঠিন। তিনি আরও বলেন, অনেক আগেই প্রতিষ্ঠানটিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া বা এর সিংহভাগ মালিকানা অভিজ্ঞ কোনো বিদেশি কোম্পানির হাতে হস্তান্তর করা উচিত ছিল, যা না করাকে তিনি ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই টেলিটককে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া উচিত।
