টিকে গ্রুপের জালিয়াতির পরও নীরব কর্তৃপক্ষ

টিকে গ্রুপের জালিয়াতি ধরা পড়ার পরও শুধু একটি চিঠি দিয়ে দায় সেরেছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। অন্যদিকে কয়েক মাস আগে চিঠি পেলেও কোনো জবাব দেয়নি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। অথচ টিকে গ্রুপের ক্যাপটিভ গ্যাস সংযোগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ জালিয়াতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। যিনি এনওসি দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না, তিনি ভুয়া এনওসি দিয়েছেন, আবার যে চিঠি গ্রহণযোগ্য নয়, সেটিই গ্রহণ করে ফাইল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এমন জালিয়াতি সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। অথচ তার কোনো নাম নিশানা দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের ওই জালিয়াতি ধামাচাপা দিতে তৎপর দেখা যাচ্ছে অনেককে। বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন বেকার বসে থাকছে, অন্যদিকে ক্যাপটিভ বিদ্যুতের সংযোগ থামানো যাচ্ছে না। তখন ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে পরিপত্র (৩১ আগস্ট ২০২১ সাল) জারি করা হয়। এতে ১০ মেগাওয়াটের বেশি ক্যাপটিভ বিদ্যুতের সংযোগ পেতে হলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়।

সেই এনওসি না পেয়ে অন্ধকার পথ ধরে টিকে গ্রুপ। ফৌজদারহাট বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের এখতিয়ার না থাকলেও তাদের নামে এনওসি দাখিল করা হয়। কথিত রয়েছে এর পেছনে একটি বিশাল সিন্ডিকেট কাজ করেছে, যারা কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে ফাইলটি অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। কেজিডিসিএল এর ১৬৯তম বোর্ডসভায় (৯ সেপ্টেম্বর ২০২১) টিকে গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী স্টিল মিলস লিমিটেডের ১৬.৮ মেগাওয়াট ক্যাপটিভ বিদ্যুতের গ্যাস সংযোগ অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন তৎকালীন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোঃ আনিসুর রহমান।

যিনি গণঅভ্যুত্থানে পলাতক শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অবসরের পর যাকে প্রাইজ পোস্টিং হিসেবে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের রাতের ভোটের অন্যতম কুশীলব বলে বিবেচনা করা হয় তাকে। জনশ্রুতি রয়েছে, গ্যাস ঘাটতির কারণে প্রবল আপত্তির মধ্যেও আনিসুর রহমানের চাপেই ভুয়া কাগজপত্রের বিপরীতে সংযোগটি অনুমোদন করা হয়েছিল তখন।

২০২৫ সালের ১৫ জুলাই সংবাদ প্রকাশের আগে এনওসি প্রদানকারী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি ফৌজদারহাট বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং পরে বদলি হয়ে বরফকুণ্ডে যোগ দেন; ফলে তিনি কখনো ফৌজদারহাটে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেননি, তাই ২০২০ সালে তার স্বাক্ষর দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তবে সংবাদ প্রকাশের পর তদন্ত কমিটির কাছে তিনি ভিন্ন তথ্য দেন। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক চিঠির জবাবে তিনি লিখেছেন, কর্ণফুলী স্টিল মিলসের অনুকূলে দেওয়া পত্রটি ক্যাপটিভ বিদ্যুতে গ্যাস সংযোগের জন্য নয় এবং এটি কোনো এনওসি হিসেবেও বিবেচ্য নয়। পরবর্তীতে ফলোআপে আবার কথা হলে তিনি দাবি করেন, তিনি ক্যাপটিভ বিদ্যুতের জন্য কোনো চিঠি দেননি, চিঠিতে এ ধরনের কোনো উল্লেখও নেই এবং বর্তমানে সেটি কার্যকর নয়; তাই ওই চিঠির ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার সুযোগ নেই। পাশাপাশি তিনি বিষয়টি নিয়ে আর অনুসন্ধান না করার অনুরোধও জানান।

প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানের চিঠির পর সংঘবদ্ধ জালিয়াতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি পাঠায়। তবে কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, গ্যাস সংযোগ অনুমোদন দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ বিপিডিবির জবাবের ওপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে টিকে গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার হাসিবুল ইসলাম হাসিব দাবি করেন, তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিয়ম হয়নি; তারা নিয়ম মেনেই আবেদন করেছেন। স্থানীয় অফিসের এনওসি দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা তাদের দায়িত্ব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল—একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে পুনরায় চালু করতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। এ কারণেই তারা ক্যাপটিভ বিদ্যুতের জন্য আবেদন করেছিলেন।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির একজন সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ক্যাপটিভ বিদ্যুতের গ্যাস সংযোগ পেতে জালিয়াতির নতুন নজির সৃষ্টি করেছে টিকে গ্রুপ। আমার সময়ে তাদের অনেক ভুয়া কাগজ ধরেছিলাম। তাদের কাগজপত্র যাচাই করলে আরও অনেক জালিয়াতি পাওয়া যাবে। তারা আগের সরকারের সময়ে জ্বালানি উপদেষ্টার (তৌফিক ই-ইলাহী চৌধুরী) দফতর থেকে নানা বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করতো। টিকে গ্রুপের জালিয়াতির কিছুটা নজির পাওয়া যায় গ্যাসের চাপ কারসাজিতে। তাদের সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে গ্যাসের চাপ জালিয়াতির মাধ্যমে ১৩ কোটি ৭২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ওই টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেজিডিসিএল।

২০১৮ সালের ২২ জুলাই ডিজিটাল ডাটাবেজড তৈরির সময় পরস্পর যোগসাজসে প্রেসার ফ্যাক্টর ২.৬২৯ এর আলোকে বিল ইস্যু করা হয়। এতে করে ২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে সরবরাহকৃত গ্যাসের সঠিক পরিমাণে বিল আদায় হয়নি। প্রতি মাসে প্রায় ২০ লাখ টাকার মতো বিল কম জমা দিয়েছে সামুদা কেমিক্যাল। প্রেসার জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে টিকে গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার হাসিবুল ইসলাম হাসিব বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে বিচারাধীন থাকায় এখন কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।

** গ্যাস বিল জালিয়াতি করে ১৩.৭২ কোটি টাকা আত্মসাৎ