জ্বালানি সংকটে বড় ভরসা সিলেট

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের প্রভাব অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পড়েছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন এখন নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, পেট্রল ও অকটেন নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সিলেটের পেট্রল-অকটেন উৎপাদনকেন্দ্রগুলো নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। এসব কেন্দ্রে গ্যাসের সঙ্গে পাওয়া কনডেনসেট (উপজাত) থেকে পেট্রল, অকটেন, ডিজেল, কেরোসিন ও কিছু এলপিজি উৎপাদন করা হয়। এসব কনডেনসেট সিলেটের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেটে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল), সিলেট গ্যাসফিল্ড লিমিটেড (এসজিএফএল) এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) তেল-গ্যাস উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এসব কোম্পানির সঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠান শেভরনও কাজ করছে। এই চারটি প্রতিষ্ঠান কনডেনসেট উৎপাদনের পর তা প্রক্রিয়াজাত করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের মাধ্যমে বাজারজাত করে থাকে। কনডেনসেট থেকে মোট চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ পেট্রল এবং ২০ থেকে ২৫ শতাংশ অকটেন উৎপাদন করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দেশে তেল সংকট দেখা দিলেও রিজার্ভ শূন্যের কোটায় নামার কোনো ঝুঁকি নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, এসজিএফএল থেকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। তেমনি গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত কনডেনসেট (প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে থাকা এক ধরনের তরল হাইড্রোকার্বন, যা সাধারণত গ্যাস উত্তোলনের সময় চাপ ও তাপমাত্রা কমলে তরলে পরিণত হয়) থেকে দেশে পেট্রলের মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অকটেন উৎপাদন হয়। অথচ সিলেটে গ্যাসের কনডেনসেট সম্পর্কে স্থানীয়দের কোনো ধারণা নেই।

সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্লান্ট দৈনিক সাড়ে ৬ হাজার ব্যারেল কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম। তবে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বর্তমানে প্লান্টগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যাচ্ছে। এই কনডেনসেট থেকে সাড়ে ৩ হাজার ব্যারেল পেট্রল, ৬০০ ব্যারেল অকটেন এবং ১৫০ ব্যারেল কেরোসিন ও ডিজেল উৎপাদন হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকার অকটেন উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। এ প্রেক্ষিতে সিলেট গ্যাস ফিল্ডের প্লান্টে ৬০০ ব্যারেলের পরিবর্তে ৭০০ ব্যারেল অকটেন উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পুরোনো কূপগুলোর সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোরও তাগিদ দিয়েছে সরকার বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। পাশাপাশি প্রতিদিন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের ট্যাংক লরির মাধ্যমে এসব জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে, যা সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ডিলারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

সিলেট গ্যাস ফিল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ফারুক হোসেন বলেন, তিনটি দেশি কোম্পানির মাধ্যমে এখানে উৎপাদন হয়। আরেকটি বিদেশি কোম্পানি রয়েছে-শেভরন। সব মিলিয়ে সারা দেশে সাড়ে ৬ হাজার ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন হয়। এখান থেকে সরকার আমাদের বরাদ্দ দেয় ৪ হাজার ৫০০ ব্যারেল। এটি রশিদপুরে পরিশোধন করে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ব্যারেল পেট্রল, ৭ থেকে ৮ ব্যারেল অকটেন এবং দশমিক ২ থেকে ৩ শতাংশ ডিজেল উৎপাদন হয়। উৎপাদনের পর সেটি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মাধ্যমে বিপণন করা হয়। তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি সংকট থাকলে সপ্তাহের সাতদিনই সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। তাই বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেল বা কনডেনসেট আমদানি বন্ধ হতে পারে। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন বন্ধ হবে না।

ব্যবসায়ীরা জানান, ডিজেল এবং জেট ফুয়েল বা কেরোসিন শুধু মধ্যপ্রাচ্য থেকেই আমদানি করা হয় না, হয় অন্য জায়গা থেকেও। গত মাসে মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার এবং ভারত থেকে ২২ হাজার টন ডিজেল কিনেছে সরকার। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও ডিজেল আসে। দেশে দৈনিক অকটেনের চাহিদা প্রায় ৮ হাজার টন এবং পেট্রলের সাড়ে ১১ হাজার টন। এই দুটি পণ্য দেশেই উৎপাদন হয়, আমদানির প্রয়োজন হয় না। এ তথ্য দেশের বেশিরভাগ মানুষই জানে না। সংকট নেই- বিষয়টি সরকারের উচিত আরও বেশি করে প্রচার করা। তবে পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের পেছনে নানা কারণ রয়েছে। অনেকেই অল্প সময়ে বেশি লাভের আশায় তেল মজুদ করেন। তারা পেট্রল পাম্পগুলোর সঙ্গে যোগসাজশে বিভিন্ন জায়গায় তেল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ফলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। অতীতে সরকারগুলো সঠিক তথ্য গোপন করায় এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে তাদের ধারণা।