জুয়েলারির টার্নওভার কর অর্ধেক করার পরিকল্পনা

দীর্ঘদিন ধরেই দেশের স্বর্ণ ব্যবসা খাত কার্যত রাজস্ব বিভাগের আওতার বাইরে রয়েছে। দেশে হাজার হাজার জুয়েলারি ব্যবসায়ী থাকলেও আয়কর রিটার্নে প্রকৃত বিক্রি ও আয় প্রদর্শনের প্রবণতা তাদের মধ্যে খুবই কম। তাই খাতটিকে করজালের আওতায় আনা এবং প্রকৃত বিক্রির তথ্য প্রকাশে উৎসাহিত করতে আগামী বাজেটে জুয়েলারি খাতের টার্নওভার কর কমানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান করহার ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশে স্বর্ণ ব্যবসা বড় একটি খাত হলেও প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। স্বর্ণ বিক্রিতে ৫ শতাংশ ভ্যাট বিদ্যমান থাকলেও আদায় তুলনামূলকভাবে সীমিত। একই চিত্র আয়কর আদায়ের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। অনেক ব্যবসায়ী বিক্রির প্রকৃত তথ্য গোপন করেন, এমনকি কেউ কেউ আয়কর রিটার্নে নিজের পেশাও উল্লেখ করেন না। দেশে প্রায় ৫০ হাজার স্বর্ণ ব্যবসায়ীর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সদস্য। তবু তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো করজালের বাইরে রয়েছে। তাই করহার কমিয়ে স্বেচ্ছায় কর পরিপালন বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি এনবিআরের সঙ্গে বৈঠকে এবং পরে এক চিঠিতে মোট বিক্রির ওপর আরোপিত ১ শতাংশ টার্নওভার কর কমিয়ে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে বাজুস। সংগঠনটির যুক্তি, বর্তমান করহার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী প্রকৃত বিক্রির তথ্য দেখাতে নিরুৎসাহিত হন। করহার কমানো হলে তারা প্রকৃত বিক্রি প্রদর্শন করবেন, ফলে সামগ্রিক রাজস্ব আদায় বাড়বে।

বাজুসের দাবি, জুয়েলারি ব্যবসায় লাভের পরিমাণ তুলনামূলক কম। তাই টার্নওভার করের হার কমালে করের বোঝা ‘বাস্তবসম্মত’ হবে। একই সঙ্গে তারা উৎসে আয়কর কর্তনের বিধান প্রত্যাহার অথবা হার কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাবও দিয়েছে। সমিতির মতে, উৎসে কাটা কর ও টার্নওভার করের মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগ থাকলে ব্যবসায়ীরা দ্বৈত করের চাপ থেকে মুক্ত থাকবেন।

তবে এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, করহার কমানোর বিষয়টি মূলত করজালের বিস্তারের কৌশল। বাজুস প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, করহার কমানো হলে সদস্যরা প্রকৃত বিক্রির তথ্য দেখাবেন এবং নিয়মিত কর দেবেন। সেই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই প্রস্তাবটি বিবেচনা করা হচ্ছে। বাজেট-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘স্বর্ণ খাত দেশের অন্যতম বড় ব্যবসা খাত। কিন্তু এখান থেকে প্রত্যাশিত কর পাওয়া যায় না। করহার কিছুটা কমিয়ে যদি হাজার হাজার ব্যবসায়ীকে কর নেটের আওতায় আনা যায়, সেটিই হবে বড় অর্জন।’ তিনি আরও বলেন, ‘কর কমানোর উদ্দেশ্য রাজস্ব ছাড় দেওয়া নয়; বরং যারা এখনও কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন, তাদেরকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় নিয়ে আসা। এতে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আদায় আরও বাড়বে।’ এনবিআরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি সীমিত। ব্যাগেজ রুলস এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে আসা স্বর্ণের বড় অংশের লেনদেনও পুরোপুরি নথিভুক্ত হয় না। ফলে প্রকৃত ব্যবসার আকার নির্ধারণ এবং কর আদায়— দুই ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি হয়।