গত জুন মাসে দেশে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩৮ জন এবং আহত হয়েছেন আরও ৫৬১ জন। নিহতদের মধ্যে ৪৪ জন নারী ও ৫৬ জন শিশু রয়েছেন। এ সময় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাতেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে—১৩৪ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩১ শতাংশ। রোববার (৫ জুলাই) প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মাসিক দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংগঠনটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, জুন মাসে মোট ১৪৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩০ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সময়ে পথচারী নিহত হয়েছেন ৯১ জন, যা মোট মৃত্যুর ২০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এ ছাড়া ৫৭ জন চালক ও পরিবহন-সহকারীও প্রাণ হারিয়েছেন। যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের পর সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে থ্রি-হুইলার যাত্রীদের মধ্যে—এতে নিহত হয়েছেন ১১২ জন। পাশাপাশি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ ও ট্রলিতে ৩৭ জন, বাসে ২৭ জন এবং প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সে ১৪ জন আরোহী নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার মধ্যে ১৫১টি জাতীয় মহাসড়কে, ১৯৪টি আঞ্চলিক সড়কে, ৬৪টি গ্রামীণ সড়কে এবং ৫৭টি শহরের সড়কে ঘটেছে। অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ২০৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া ১০৯টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৯৭ পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া এবং ৫৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে সামনে থাকা যানবাহনের পেছনে আঘাত করার কারণে।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি হয়েছে ঢাকা বিভাগে। সেখানে ১১৬টি দুর্ঘটনায় ১১৮ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৩২টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ৪৯ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ১৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে, যেখানে নিহত হয়েছেন ১৬ জন। সড়কের পাশাপাশি জুনে ৯টি নৌ দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ২১টি রেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৮ জনের এবং আহত হয়েছেন ৭ জন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়কব্যবস্থা, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও ন্যায্য বেতনের অভাব। পাশাপাশি মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল, তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিও দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা কমাতে সংগঠনটি ১২ দফা সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলকে আরও কার্যকর করা, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সংস্কার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ জোরদার করা, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং মহাসড়কে নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তোলা।
