ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক ও বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের মিরপুর ডিওএইচএসের বাসায় অভিযান চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (২৯ জুলাই) দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল সেখানে ইনভেন্টরি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর আগে তার জলসিঁড়ি এলাকার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সাদা স্বর্ণের অলঙ্কারসহ শত কোটি টাকার সম্পদের নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছিল।
সংস্থাটির উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আজ দুদক ইনভেন্টরি কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং অভিযান শেষে বিস্তারিত জানানো হবে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ একটি দল মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের মিরপুর ডিওএইচএসের ৩১ নম্বর সড়কের ৫৪১ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে এ কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর আগে গত ২০ জুলাই জলসিঁড়ি আবাসিক প্রকল্পের ‘জয়িতা’ নামের ভবনের অষ্টম ও নবম তলার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালায় দুদক। সেখানে স্বর্ণ ও হোয়াইট গোল্ডের অলঙ্কার, মূল্যবান আসবাবপত্র, চেকবই, মানি রিসিট ও পোশাকসহ অন্তত শত কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদের প্রমাণ পাওয়া যায়।
গত ২৭ জানুয়ারি সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে থাকা ক্রোক করা (অ্যাটাচড) স্থাবর সম্পত্তির সঠিক ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন জেলা প্রশাসক এবং গণপূর্ত বিভাগকে ‘রিসিভার’ (তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে নিয়োগ দেয় আদালত। দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. হাফিজুল ইসলাম জিয়াউল আহসানের ক্রোক করা সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রিসিভার নিয়োগের প্রার্থনা জানিয়েছিলেন।
২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি জিয়াউল আহসান ও তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৩৪২ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করে দুদক। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, জিয়াউল আহসানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্পেস ইনোভেশন লিমিটেডের একটি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২৭ কোটি ১০ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি এআই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও এআই ল্যান্ডস্কেপ লিমিটেড নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ২৫ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্যও শনাক্ত করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জিয়াউল আহসানের ঢাকায় একটি আটতলাসহ পাঁচটি বাড়ি, একটি বাগানবাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট ও ৩ হাজার ৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ জমি রয়েছে। এ ছাড়া তার দুটি জিপ গাড়ি, শেয়ারবাজারে পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগ, এক কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র ও সীমা লঙ্ঘন করে ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার ব্যাংক হিসাবে জমা করার তথ্য রয়েছে। তার স্ত্রীর নামে ১৬৪ দশমিক ৯১ শতাংশের প্লট, ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তারা এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অন্যদিকে জিয়াউল আহসান ও নুসরাত জাহানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সাজগোজ লিমিটেডের তিনজন পরিচালক তাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৬ ব্যাংকের ৮২টি হিসাবে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকা জমা ও ৩৯০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। নুসরাত জাহানের ব্যাংক হিসাব থেকে জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের ব্যাংক হিসাবে ৯১ লাখ ৭২ হাজার ৯১৫ টাকা ও আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ব্যাংক হিসাবে ৩৭ লাখ ৮৪ হাজার ৮৪৫ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে।
২০১৭ সালে জিয়াউল আহসান অ্যান্টিগা অ্যান্ড বারবুডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন বলে জানিয়েছে দুদক। ওই দেশের নাগরিকত্ব নেওয়ার সময় জিয়াউল আহসান ও তার পরিবার দুই লাখ মার্কিন ডলার মালয়েশিয়ার দুটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পরিশোধ করেন। এছাড়া জিয়াউল আহসান অ্যান্টিগা অ্যান্ড বারবুডার পাঁচ বছর মেয়াদি বন্ডে প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিনিয়োগ করেছেন বলে জানা গেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, জিয়াউল আহসান দুবাইয়ের ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংকের একটি হিসাবে প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং অন্য একটি হিসাবে ৭৫ কোটি টাকা পাচার করেছেন। এছাড়া মালয়েশিয়ার একটি ব্যাংকে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্যাংক হিসাবেও বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুদক তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এদিকে, গত ১৯ আগস্ট গুম-খুনের ‘মাস্টারমাইন্ড’, ফোনে আড়িপাতা, ব্যক্তিগত আলাপ রেকর্ড ও ফাঁসের অভিযোগে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত জিয়াউল আহসান, তার স্ত্রী-সন্তান এবং তাদের মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
** জিয়াউল আহসানের হিসাবে ১২০ কোটি টাকার লেনদেন
** জিয়াউলের ভবনে সাদা সোনাসহ মিলল শত কোটি টাকার সম্পদ
** বাস্তব সম্পদে ভরপুর, কর ফাইলে নামমাত্র
