জিপিএইচ ইস্পাত ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা বলে রাইট শেয়ার ছাড়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করলেও তা নির্ধারিত সময়ে ব্যবহার করতে পারেনি। অর্থ অব্যবহৃত থাকলেও কোম্পানিটির ঋণ বেড়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে নিরীক্ষিত তথ্যের বদলে অনিরীক্ষিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তোলার পরও ঋণের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে কোম্পানিটি তা পরিশোধের ক্ষমতা হারিয়েছে। ঋণের চাপ বাড়লেও কোম্পানির উৎপাদন ক্ষমতা গত কয়েক বছরে অপরিবর্তিত রয়েছে।
উৎপাদন ক্ষমতা বাড়েনি, তবু ঋণ বাড়ায় বিশেষজ্ঞ ও বিনিয়োগকারীরা অস্বাভাবিক মনে করছেন। তারা বলছেন, কোম্পানির কার্যক্রম ও ঋণের ব্যবহার বিএসইসি খতিয়ে দেখা উচিত। ২০১২ সালে ঋণের সুদ কমাতে পুঁজিবাজার থেকে ৬০ কোটি টাকা তোলা হলেও, এর ৫৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা কেবল ঋণ পরিশোধে ব্যবহার হয়েছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আগে ২০১০-১১ হিসাব বছরের শেষে জিপিএইচ ইস্পাতের ঋণ ছিল ৩১১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ২০১৮ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,১৫৩ কোটি ৫১ লাখ টাকায়, অর্থাৎ ৮৪২ কোটি ২০ লাখ টাকার বৃদ্ধি। সর্বশেষ অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরে ৬২৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করতে হবে, কিন্তু কোম্পানির সক্ষমতা মাত্র ২৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ফলে চলতি বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা পরিশোধের জন্য সম্পদ বিক্রি বা নতুন ঋণ নেওয়াই কার্যকরি বিকল্প।
অবশ্য চলতি হিসাব বছরের নয় মাস সময়ের যে প্রতিবেদন কোম্পানিটি প্রকাশ করেছে তাতে স্থায়ী সম্পদ ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৭ সালের ৩০ জুন শেষে কোম্পানিটির প্রোপার্টি, প্ল্যান্ট ও ইকুইপমেন্ট ছিল ১৬৪ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার টাকার। যা চলতি বছরের ৩১ মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ১৬২ কোটি ১৬ লাখ ১১ হাজার টাকা। একই সঙ্গে কমেছে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদের বিনিয়োগ। ২০১৭ সালের ৩০ জুন কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ছিল ৩৬ কোটি ৪১ লাখ ৮১ হাজার টাকা, যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি চার লাখ ৮৭ হাজার টাকায়। ২০১৭ সালের ৩০ জুন শেষে থাকা ২৪৪ কোটি ৩৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকার স্বল্পমেয়াদের বিনিয়োগ চলতি বছরের মার্চ শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ১৮৬ কোটি এক লাখ ২৪ হাজার টাকায়।
স্থায়ী সম্পদ ও বিনিয়োগ কমলেও কোম্পানিটির দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদের ঋণের পাল্লা ভারী হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে জিপিএইচ ইস্পাতের দীর্ঘমেয়াদে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২১ কোটি ১৭ লাখ ১৮ হাজার টাকা। যা ২০১৭ সালের জুন শেষে ছিল ১৭২ কোটি ৯ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ নয় মাসের ব্যবধানে দীর্ঘমেয়াদের ঋণ বেড়েছে তিনগুণের বেশি। অপরদিকে ২০১৭ সালের ৩০ জুন শেষে থাকা ৪৯৭ কোটি ১৪ লাখ টাকার স্বল্পমেয়াদের ঋণ চলতি বছরের মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ৬১০ কোটি ৮৭ লাখ টাকায়। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদের ঋণের কারেন্ট পোরশন হিসাবে ১০ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ফাইন্যান্স লিজের কারেন্ট পোরশন হিসাবে আরও দুই কোটি ৪৭ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে।
এদিকে ঋণের পাল্লা ভারী হলেও কোম্পানিটির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ছে না। ২০১১-১২ হিসাব বছরে জিপিএইচ ইস্পাতের এমএস রড উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল এক লাখ ২০ হাজার টন। ২০১৬-১৭ হিসাব বছরেও এমএস রড উৎপাদনের ক্ষমতা সেই এক লাখ ২০ হাজার টনে সীমাবদ্ধ রয়েছে। অপরদিকে এমএস ব্লেড উপাদন ক্ষমতা ২০১২-১৩ হিসাব বছরে ছিল এক লাখ ৬৮ হাজার টন। ২০১৬-১৭ হিসাব বছরেও এমএস ব্লেড উৎপাদন ক্ষমতা এক লাখ ৬৮ হাজার টনে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
উৎপাদন সক্ষমতা একই স্থানে সীমাবদ্ধ থাকলেও ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত চার বছরে কোম্পানিটির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩৯৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ২০১২-১৩ হিসাব বছরে ঋণ ছিল ২৯০ কোটি ২৩ লাখ টাকা, যা ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। কোম্পানিটির ঋণের পরিমাণ প্রতি বছর আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। ২০১৩-১৪ বছরে ঋণ ছিল ৩৩৫ কোটি ৩৪ লাখ, ২০১৪-১৫ বছরে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫৪ কোটি ৫ লাখ, এবং ২০১৫-১৬ হিসাব বছরে ৪৬৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বার্ষিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে কোনো বছরই কোম্পানিটি সেই বছরের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে প্রতি বছর ঋণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে, কখনও দীর্ঘমেয়াদি আবার কখনও স্বল্পমেয়াদি ঋণ।
জিপিএইচ ইস্পাত ২০০৮ সালে ব্যবসা শুরু করে। চার বছরের মাথায় এসে ২০১২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এ সময়ে কোম্পানিটি ব্যবসায়িক সাফল্যে ৩০ টাকা (প্রিমিয়াম ২০ টাকা) দরে শেয়ার ইস্যু করে ৬০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। কিন্তু কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে আসার চার বছর পর ১৪ টাকা দরে ১৮ কোটি ৭১ লাখ ১০ হাজার রাইট শেয়ার ইস্যু করে ২৬১ কোটি ৯৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে। ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে রাইট শেয়ার ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করলেও কোম্পানিটি সেই অর্থ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবহার করতে পারেনি। অবশ্য রাইটের অর্থ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবহারে ব্যর্থ হয়ে ইজিএম’র মাধ্যমে এক বছর সময় বাড়িয়ে নিয়েছে কোম্পানিটি।
এ বিষয়ে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ঋণ পরিশোধের কথা বলে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তোলার পর কেন ঋণ আরও বাড়ছে তা বিএসসির খতিয়ে দেখা উচিত। একদিকে ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে না- এটা কিছুতেই যুক্তিসঙ্গত নয়। কোম্পানি ঋণের টাকা কোথায় ব্যবহার করছে তা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে খতিয়ে দেখতে হবে।’

