একসময় সাগর ও পাহাড়ঘেরা সবুজ-শ্যামল গ্রাম ছিল মছজিদ্দা। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এই গ্রামটি এখন চরম বেহাল। সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায় পুরো এলাকা। জলাবদ্ধতা একবার শুরু হলে তা থাকে টানা মাসজুড়ে। ফলে পুরো বর্ষা মৌসুমে পানিবন্দী জীবন কাটাতে হয় গ্রামবাসীর। নানা সবজির জন্য পরিচিত এই গ্রাম এখন প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। দাশপাড়া বহু আগেই দখলে নিয়েছে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড। সেখানে বসবাসকারী প্রায় চার শতাধিক হিন্দু পরিবার চাপের মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বাকিরাও সুযোগ পেলেই এলাকা ছাড়তে চান। এই সংকটের সূচনা জিপিএইচ ইস্পাতের আগ্রাসী ভূমিকা থেকেই। ২০১৮ সালে কারখানা সম্প্রসারণের সময় প্রতিষ্ঠানটি রাস্তা, ব্রিজ থেকে শুরু করে খাল পর্যন্ত দখলে নেয়—যার পর থেকেই গ্রামটি ভয়াবহ জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে।
মছজিদ্দা গ্রামের পূর্বদিকে প্রায় ছয় কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে বাঁশবাড়িয়া পাহাড়ের বিশাল জঙ্গল (প্রায় ৫০ হাজার একর)। আর পশ্চিম দিকে বিস্তৃত সাগর। পাহাড় ও সাগরের মাঝখান দিয়ে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক; মহাসড়কের পূর্ব পাশে অবস্থান মছজিদ্দা গ্রামের। প্রাকৃতিকভাবে পাহাড়ি পানির প্রবাহ ঝিরি বেয়ে নেমে এসে মহাসড়কের পূর্বদিকে থাকা প্রায় ৪০ ফুট প্রশস্ত খালে পড়ে। সেখান থেকে দক্ষিণ মছজিদ্দা ব্রিজের নিচ দিয়ে তা সাগরে প্রবাহিত হতো। কিন্তু এই খাল ভরাট করে জিপিএইচ ইস্পাত তাদের কারখানা নির্মাণ করায় সেই স্বাভাবিক পানি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য মাটির নিচে একটি সরু রিং বসানো হয়েছে, যা দিনে পানি নামানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তাও আবার উঁচু করে বসানোর কারণে পানি জমে আরও ভয়াবহভাবে আটকে থাকে। পাশাপাশি ১৬ ফুটের একটি ব্রিজ ভাঙা করে মাত্র ৫ ফুট করা হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে গ্রামজুড়ে পানি নামার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে থাকে, আর বাড়িঘর দীর্ঘদিন পানিতে তলিয়ে থাকে।

গ্রামবাসী দফায় দফায় লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো সুরাহা হয়নি। শুধু চিঠি চালাচালি চলছে, ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার থেকে শুরু করে, উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা, ইউএনও, পরিবেশ অধিদফতর, জেলা প্রশাসন, পিবিআই, সিআইডি, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তদন্তেও সত্যতা উঠে এসেছে। তারা শুধুই চিঠি চালাচালি করে দায় সারছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী গ্রামবাসী আবুল কালাম (পিতা আব্দুল মালেক)। জিপিএইচ ইস্পাত কারখানার উত্তরদিকে তার কয়েক পূরুষের বসতভিটা।
আবুল কালাম বলেছেন, জিপিএইচ ইস্পাত কারখানা হওয়ার পর থেকেই এই অবস্থা। একদিন বৃষ্টি হলে কমপক্ষে পনের দিন থেকে ১ মাস পর্যন্ত পানি আটকে থাকে। ইউএনও, ম্যাজিস্ট্রেটসহ অনেকে এসে দেখে গেছেন। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘ওনিরা আমাদের কথা শুনবো। এখানে চিটাগাংগের ম্যাজিস্ট্রেট পর্যন্ত আইচে। ওনিও ব্যাক লেখি-টেকি নিয়ে গেছে, কিন্তু কার্যকরী ন হয়। কে যে দাফন করি রাখি দিছে।’
স্থানীয় ভূক্তভোগী মানবাধিকার কর্মী আবু বক্কর কমকে বলেছেন, ছয়টি তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ঘুষ নিয়েছে প্রশাসনের কর্মকর্তারা। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আছে তিনটি, দুর্নীতি দমন কমিশন, এনএসআই, পরিবেশ অধিদফতর, পিবিআই, সিআইডি তদন্ত করেছে। এছড়া সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী, সীতাকুণ্ড এসি ল্যান্ড ও কুমিরা ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা তদন্ত করেছেন। সব রিপোর্টে পরিবেশ দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে জিপিএইচ ইস্পাত। সর্বশেষ জেলা প্রশাসক, সড়ক ও জনপথ বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন, চট্টগ্রাম সওজ মাটি সরাইয়া নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন, এখনো সরাইয়া নেওয়া হয় নাই।

সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, ‘ডিসি স্যার (জেলা প্রশাসক) এসি ল্যান্ডকে (সহকারী কমিশনার ভূমি) তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে বলেছেন। তদন্ত করে রিপোর্ট দেওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন। পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম অফিসের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগের শেষ নেই। তারা বলেছেন, তারা ঘুষের বিনিময়ে চুপ হয়ে গেছে। ২০২২ সালের ৩ অক্টোবর নোটিশ জারি করেছিলেন পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক মুফিদুল আলম। চিঠিতে লিখেছেন, সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, আপনারা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত সরকারি ছড়ায় লোহার তারের নেট ও মাটি দ্বারা ছড়ার পানি চলাচলের পথ বন্ধ করার মাধ্যমে ওই এলাকায় জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ, মাটির ভূ-প্রকৃতি পরিবর্তনসহ পরিবেশ ও প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করেছেন।
সীতাকুণ্ড উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার ছৌজি চাকমার রিপোর্টেও ভয়াবহতা উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন, সরেজমিন তদন্তে দেখা যায় মছজিদ্দা মৌজায় বিএস ৪৪৬০ এবং ৩৪৪ দাগের জমি রাস্তা/সড়ক শ্রেণির জমি। তদন্তকালে জানা যায়, বর্ণিত রাস্তার নিচ দিয়ে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড প্রায় ৭ ফুটের প্রস্থ বিশিষ্ট পাইপ বসিয়েছেন। ফলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের পানি পূর্বের ন্যায় কুমিরা খালে না পড়ে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড কর্তৃক নির্মিত পাইপ দিয়ে পানি মগপুকুর এলাকায় ঢুকে পড়ে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশ ঘেষে বয়ে চলা আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ ফুট চওড়া খাল ভরাট করায় উক্ত খাল দিয়ে পানি বা বর্জ্য অপসারণ বাধাগ্রস্ত হয়। যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের ৪০০ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে। এ ছাড়া জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড ১৬ ফুটের ব্রিজ ভেঙে ৫ ফুট করে ফেলে এবং উঁচু করেছে। ফলে উত্তর দিকের পানি দক্ষিণ দিকে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

