জিপিএইচ ইস্পাতের অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই মিথ্যা মামলা দায়েরের শিকার হতে হচ্ছে মানুষকে। প্রতিবাদী মানবাধিকার কর্মী আবু বক্কর চৌধুরীর বিরুদ্ধে এ ধরনের ২০টির মতো মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব মামলায় কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় মামলাবাজদেরও ব্যবহার করা হয়েছে। তবে প্রতিটি মামলায় আবু বক্কর চৌধুরীকে নির্দোষ প্রমাণ করা হয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী আবু বক্কর চৌধুরী বলেছেন, ‘প্রথমে তারা আমাকে টাকার লোভ দেখায়, কাজ না হওয়ায় একের পর এক মামলা দিয়েছে। কোন মামলাই প্রমাণ করতে পারেনি। অগ্নিসংযোগ, কারখানায় চাঁদাবাজিসহ ২০টির মতো মিথ্যা মামলা দিয়েছে আমার নামে।’ তিনি বলেন, ‘মামলা দিয়ে আমার জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। আরও অনেকের নামে মামলা দিয়ে ভিটে ছাড়া করেছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে অনেকের জমি জবরদখল করেছে তারা। বাবুল নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রথমে মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা দেওয়া হয়, তারপর এলাকা ছাড়া হলে তার জমি দখল করে নিয়েছে জিপিএইচ। অনেকে জীবন বাঁচাতে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাবুল মিয়া জমি বিক্রি করেননি সেই কথা ফেসবুকে লিখেছি। এর জন্য আমাকে ১ নম্বর আর বাবুলকে ২ নম্বর আসামি করে জিপিএইচ ইস্পাতের কর্মকর্তা গোলাম মোক্তাদির কোর্টে জালিয়াতির মামলা (৭২৪/২৫) দিয়েছে। প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়ে এখন নাকি সেই মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে শুনেছি।’
আবু বক্কর চৌধুরী বলেন, ‘এলাকার চোর-ডাকাতদের টাকা খাইয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলার বাদি বানিয়েছে। আবুল মনসুর (পিতা- ইউসুফ আলী) তেমনি একজন চিহ্নিত অপরাধী। সেই আবুল মনসুর বাদি হয়ে মিথ্যা অগ্নিসংযোগের মামলা (২০২৩ সাল) দিয়েছে আমার নামে। আমাদের বাগানের পাশে আবুল কাশেমের জায়গা সেখানে আগুণ দিয়ে উল্টো আমাকে এবং আবুল কাশেমকে ফাঁসানো হয়। গোপনে মামলা করে টাকা দিয়ে রাতেই আমাকে গ্রেফতার করায়। ট্যুরিস্ট পুলিশ তদন্ত করে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে।’
জিপিএইচ ইস্পাতে অপরাধের শেষ নাই কিন্তু প্রশাসন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। কেউ প্রতিবাদ করলে গুম, খুন অপহরণের হুমকি দেওয়া হয়। আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, আইন মন্ত্রী, ওবায়দুল কাদেরসহ অনেক এমপি মন্ত্রিদের নাম বিক্রি করে সাধারণ মানুষকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করে রেখেছিল। ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের পর আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু কোন প্রতিকার দেখতে পাচ্ছি না।

আবু বক্কর চৌধুরীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত চাঁদাবাজি মামলার (৫২৬/২০২২ সিআর) প্রথমে পিবিআই তদন্ত করে ফাইন্যাল রিপোর্ট দেয়, এতে নারাজি দেয় জিপিএইচ। দ্বিতীয় দফায় তদন্ত করে সিআইডি উপ-পুলিশ পরিদর্শক রাশেদুল ইসলাম। তিনি রিপোর্টে লিখেছেন, তদন্তকালে আরও দেখা যায়, মামলার বিবাদী (আবু বক্কর চৌধুরী) স্থানীয় মানুষজনের দুর্ভোগ লাঘব করার জন্য বিভিন্ন দফতরে পত্র প্রেরণসহ স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা তুলে ধরেন। উল্লেখিত কারণে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের মালিক ও কর্মকর্তাগণ বিবাদীর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়। যে কারণে রাগ ও ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেছেন। তদন্তকালে মামলার বাদী কোন সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন নাই। প্রকৃতপক্ষে বিবাদী আবু বক্কর চৌধুরীকে বিতর্কিত করার মাধ্যমে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে মামলা দায়ের করেছে বলে প্রতীয়মান হয়।
সিআইডির রিপোর্টে বলা হয়েছে, মামলার এজাহারে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলেও ঘটনাস্থলের সিসি ফুটেজ প্রদানে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৮ সালে কারখানা সম্প্রসারণের সময় জিপিএইচ ইস্পাত রাস্তা, ব্রিজ ও খাল দখল করেছে। মছজিদ্দা গ্রামের পূর্বদিকে প্রায় ছয় কিলোমিটার বিস্তৃত বাঁশবাড়িয়া পাহাড় (৫০ হাজার একর) এবং পশ্চিম দিকে সাগর অবস্থিত। পাহাড় ও সাগরের মাঝখান দিয়ে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, যার পূর্বপাশে অবস্থান মছজিদ্দা গ্রাম।
ঐতিহাসিকভাবেই পাহাড়ের পানি বিভিন্ন ঝিরির মাধ্যমে নেমে আসে মহাসড়কের পুর্বদিকের ৪০ ফুট প্রশস্ত খালে। সেই খালের পানি দক্ষিণ মছজিদ্দা ব্রীজের (ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক) নিচ দিয়ে সাগরে চলে যেতো। আর সেই খালটি ভরাট করে গড়ে উঠেছে জিপিএইচ ইস্পাত কারখানা। পানি নিষ্কাশনের জন্য মাটির নিচ দিয়ে একটি রিং বসানো হয়েছে, যা একদিকে পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত নয়, একই সঙ্গে উচু করে বসানোর কারণে গ্রামটিতে জলাবদ্ধতা লেগেই থাকছে। পাশাপাশি ১৬ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি ব্রীজ ভেঙ্গে ৫ ফুট করা হয়েছে। যে কারণে পুরো বর্ষা মৌসুম বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে থাকছে।
গ্রামবাসী দফায় দফায় লিখিত অভিযোগ দিলেও কোন সুরাহা হয়নি। শুধু চিঠি চালাচালি চলছে, ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার থেকে শুরু করে, উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা, ইউএনও, পরিবেশ অধিদফতর, জেলা প্রশাসন, পিবিআই, সিআইডি, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তদন্তেও সত্যতা উঠে এসেছে। তারা শুধুই চিঠি চালাচালি করে দায় সারছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগি গ্রামবাসী আবুল কালাম।

