রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি জাল ভিসার মাধ্যমে বিদেশি যাত্রী পাঠানোর ঘটনায় যুক্ত রয়েছে। এ ঘটনায় ইতিমধ্যেই বিমানকে ২২ হাজার পাউন্ড জরিমানা গুনতে হয়েছে এবং কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কিন্তু যেসব কর্মকর্তার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। দুর্নীতিপরায়ণ এই কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে, প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জাল ভিসায় বিদেশে যাত্রী প্রেরণে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহার তথ্য চেয়ে সম্প্রতি বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওকে চিঠি দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। চিঠিতে অভিযোগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের শনাক্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুসারে, জাল ভিসা সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে নাম উঠে এসেছে বিমানের দুই কর্মকর্তার—কৃষ্ণ সুধা (চেকিং স্টাফ) ও মো. মনিরুল ইসলাম (জিএম, এয়ারপোর্ট সার্ভিস)। এ চক্রে আরও জড়িত ছিলেন মো. জাহিদুল ইসলাম, মো. জাকির হোসেন, মো. নুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম ও মো. হাবিবুর রহমান।
বিমানের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট আইএনএস গেট থেকে বিমানের বোর্ডিং পাসসহ জাল ভিসাধারী যাত্রী অফলোড করা হয়। যুক্তরাজ্যগামী জাল ভিসাধারী যাত্রীর নাম এমামুল খলিফা, যার পাসপোর্ট (এ০৪৮৩২৮৯৫)। বিমানের আইএনএস গেটের চূড়ান্ত চেক-ইনের সময় জাল ভিসার বিষয়টি ধরা পড়লে এই যাত্রীকে সকাল সাড়ে ৮টায় অফলোড করা হয়, যার ফ্লাইট নম্বর-বিজি-২০১। পরবর্তীকালে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে এই যাত্রীকে বিমানের বোর্ডিং পাস এবং ইমিগ্রেশন পার করিয়ে দেওয়ার বডি কন্ট্রাক্ট হয়।
অফলোডকৃত যাত্রীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদ, ইংরেজি ভাষাজ্ঞান না থাকা, স্টাডি ভিসা না থাকা সত্ত্বেও তাকে বোর্ডিং পাস দেন তৎকালীন বিমানের চেকিং স্টাফ কৃষ্ণ সুধা ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জিএম এয়ারপোর্ট মো. মনিরুল ইসলাম। এমন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণের পরও তাদের বিরুদ্ধে বিমান বাংলাদেশে এয়ারলাইনস বিভাগীয় কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ধামাচাপা দিতে বিমানের অনীহার বিষয় উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। কৃষ্ণ সুধা এবং মনিরুল ইসলামকে সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত জবাব চাইলে তারা কোনো প্রকার লিখিত জবাব দেননি।
বিমান সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মো. জাহিদুল ইসলাম, মো. জাকির হোসেন, মো. নুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম ও মো. হাবিবুর রহমান যাত্রীদের বৈধ কাগজপত্র যাচাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তবে তারা বিজি ০০১/১৬ ফ্লাইটের ১২ জন তামিল যাত্রীকে কোনো বৈধ নথি ছাড়া যুক্তরাজ্যে ভ্রমণের অনুমতি দেন। ফ্লাইটের পর ওই যাত্রীরা যুক্তরাজ্যে পৌঁছে রাজনৈতিক আশ্রয় দাবি করেন। ঘটনার পর যুক্তরাজ্য সীমান্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে প্রথম ৮ জনের অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ১৪ হাজার পাউন্ড এবং পরবর্তী চারজনের জন্য ৮ হাজার পাউন্ড জরিমানা করে। এছাড়া ২০১৪-১৫ সালে শ্রীলঙ্কা ও ভারতের কয়েকজন নাগরিক জাল ভিসা ও পাসপোর্ট নিয়ে কলকাতা থেকে ঢাকার মাধ্যমে লন্ডনে পৌঁছে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। বিমান সূত্র জানায়, জাল ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে যাত্রী প্রেরণের প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত রয়েছে। প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিমান কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
যদি জাল ভিসায় যাত্রী প্রেরণের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে, তবে যুক্তরাজ্যের সীমান্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে যে কোনো সময় কালো তালিকাভুক্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জাল ভিসার মাধ্যমে বোর্ডিং পাশ দিয়ে বিদেশি যাত্রী লন্ডনে প্রেরণের ঘটনা ইতোমধ্যেই বহুবার ঘটেছে। তবে এই চক্রের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখনও নেওয়া হয়নি। বিমান কর্তৃপক্ষের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে চেকিং স্টাফ কৃষ্ণ সুধা ও জিএম এয়ারপোর্ট মো. মনিরুল ইসলামের কার্যক্রম ধামাচাপা দিয়েছেন।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, উল্লিখিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে তৎকালীন বিদেশি নাগরিকদের বিমান ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর জন্য একটি কেন্দ্রিক সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন জি এম আতিক সুবহান (বরখাস্ত), বিমান শ্রমিক লীগ নেতা মশিকুর, জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার মো. ওমর ফারুক এবং ফরিদুর রহমান।
সূত্রে জানা গেছে, ফারুক দালালের মাধ্যমে যাত্রী সংগ্রহ করতেন, ফরিদ ট্রান্সফার ডেস্ক থেকে বোর্ডিং পাস ইস্যু করতেন, মশিকুর এয়ারপোর্ট ও পাসপোর্ট চেকিং ইউনিট তদারকি করতেন এবং জি এম আতিক সুবহান যেকোনো সমস্যায় তাদের আশ্রয়দাতা হিসেবে কাজ করতেন। এর ফলে পাসপোর্ট চেকিং স্টাফরা জাল ভিসা থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের ফ্লাইটে ওঠার অনুমতি দিত। অভিযোগ থাকলেও বিমান কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
