** সার্প ফ্রিজ ও জেনারেল এসি এবং জেনারেল এসির যন্ত্রাংশ চীন থেকে আমদানি করায় আটকে দেয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস; কারণ সার্প ও জেনারেল শতভাগ জাপানি ব্র্যান্ড
** যন্ত্রাংশ চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও তাইওয়ানের তৈরি; অথচ সার্প ও জেনারেলকে বাংলাদেশে জাপানি ব্র্যান্ড হিসেবে বিক্রি করা হয়
** নিলামেও জালিয়াতি করার অভিযোগ, এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্সস ও এসকোয়ার হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ নিলামে অংশগ্রহণ করলেও নামমাত্র ভুয়া দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠানকে নিলামে অংশগ্রহণকারী দেখানো হয়েছে
** নিলামে নয়টি লটে ফ্রিজ, এসি, ফ্রিজ-এসির যন্ত্রাংশ কৌশলে নিলাম থেকে বাগিয়ে নেয় এসকোয়ার
বিশ্বখ্যাত জাপানি ব্র্যান্ড সার্প ও জেনারেল। বাংলাদেশের বাজারে সার্প ব্র্যান্ডের এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্য এবং জেনারেল ব্র্যান্ডের এসির একমাত্র অনুমোদিত পরিবেশক এস্কোয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড। জাপানে তৈরি বলে এই দুইটি ব্র্যান্ডের পণ্য আমদানি করে বাজারজাত করে আসছে এস্কোয়ার। বাংলাদেশের ক্রেতারা জানতো জাপানি পণ্য, জাপান থেকে সরাসরি আমদানি হয় এই দুই ব্র্যান্ডের এসি-ফ্রিজ ও যন্ত্রাংশ। তবে, জাপান নয়-দুইটি ব্র্যান্ডের পণ্য সরাসরি আমদানি হচ্ছে চীন থেকে! আমদানি করা পণ্য বা পণ্যের প্যাকেটে উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে কখনো চীন, কখনো তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ড লেখা রয়েছে। আমদানি করা এসব পণ্য দেশের আসার পরপরই জাপানি স্টিকার লাগিয়ে তা বাজারজাত করে ক্রেতাদের ঠকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসকোয়ার গ্রুপের এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড ও এসকোয়ার হেবি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ এখানে শেষ নয়। ‘কান্ট্রি অব অরজিন’ জালিয়াতির অভিযোগে সম্প্রতি এই দুইটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা সার্প ও জেনারেল ব্র্যান্ডের বিপুল পরিমাণ এসি-ফ্রিজ ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং যন্ত্রাংশ আটক করে। পণ্য নিলামে উঠলে সেখানেও জালিয়াতি করে নামমাত্র মূল্যে তা কাস্টমস থেকে এসকোয়ারের এই দুই প্রতিষ্ঠান জালিয়াতি করে বাগিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড ও এসকোয়ার হেবি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের আমদানি করা নয়টি চালান খালাস আটক করে। প্রতিটি চালানে বিপুল পরিমাণ এসি-ফ্রিজ, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও যন্ত্রাংশ রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি চালান ২০২৪ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে, দুইটি চালান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিল মাসে কায়িক পরীক্ষা করা হয়। সবগুলো চালান চীন থেকে আমদানি করা হয়েছে। কিন্তু সার্প ও জেনারেল জাপানি ব্র্যান্ড হওয়ায় জাপান থেকে আমদানি না করে চীন থেকে আমদানি করায় আটক করা হয়। তবে কায়িক পরীক্ষায় পণ্য ও প্যাকেটের গায়ে কান্ট্রি অব অরজিন হিসেবে চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান লেখা রয়েছে। মিথ্যা ঘোষণার জন্য চালানগুলো আটক করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হবে, সেজন্য অত্যন্ত গোপনে পণ্যগুলো খালাস নেয়ার চেষ্টা করে এসকোয়ার গ্রুপের দুইটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। খালাস না করতে পেরে শেষে কাস্টমসের সঙ্গে যোগসাজস করে নিলাম থেকে নামমাত্র মূল্যে এসব পণ্য কৌশলে নিয়ে নেয় এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড।

নিলামে জালিয়াতি করে ‘সার্প ফ্রিজ’ নামমাত্র মূল্যে নিয়েছে এসকোয়ার দুই প্রতিষ্ঠান
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একাধিক সূত্রমতে, এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড চীন থেকে দুই কন্টেইনারে ২৮৭টি ‘সার্প ব্র্যান্ডের ২২০ লিটারের’ ফ্রিজ আমদানি করে। ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস চালানটি কায়িক পরীক্ষা করে। তাতে পণ্যের গায়ে কান্ট্রি অব অরজিন চীন লেখা ছিলো। তবে উৎপাদন ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ লেখা ছিলো না। জাপানি ব্র্যান্ডের পণ্য চীন থেকে আমদানি করায় তা আটক করা হয়। চলতি বছরের ১৫ কাস্টম হাউস ২৮৭টি ফ্রিজের সংরক্ষিত মূল্য দেখায় ৭৭ লাখ ৮৯ হাজার ৬০৬ টাকা। সে হিসেবে প্রতিটি ফ্রিজ দাম দাঁড়ায় প্রায় ২৭ হাজার টাকা। অথচ ২২০ লিটারের একটি সার্প ফ্রিজের বাংলাদেশের বাজারে মূল্য প্রায় ৬৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ নামমাত্র মূল্যে কাস্টমস ফ্রিজের দাম প্রস্তাব করে। ৩০ জুলাই নিলামে চারটি প্রতিষ্ঠান ও চারজন ব্যক্তি অংশগ্রহণ করে। তবে চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্সের এইচএস ইঞ্জিনিয়ারি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বাকি তিনটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান। এছাড়া চারজন ব্যক্তি এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্সের। অর্থাৎ নিলামে কৌশলে ভুয়া ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে কাস্টমসকে ম্যানেজ করে এই চালানটি নিজেরা নামমাত্র মূল্যে নিয়ে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। কারণ, জাপানি ব্র্যান্ডের পণ্য চীন থেকে আমদানি হয়েছে-বিষয়টি জানাজানি হলে বিক্রিতে প্রভাব পড়বে, সেজন্য এই জালিয়াতি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। শুধু এই চালানটি নয়-নয়টি চালান একইভাবে নিলামে তারা কারসাজি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অপরদিকে, ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর অপর একটি চালানের কায়িক পরীক্ষা করা হয়। তাতে ‘সার্প ২২০ লিটারের’ ১৩৯টি ফ্রিজ কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া যায়। কান্ট্রি অব অরজিন ছিলো চীন। ১৩৯টি ফ্রিজের সংরক্ষিত মূল্য দেখায় ৩৩ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯০ টাকা। যাতে প্রতিটি ফ্রিজের দাম দাঁড়ায় প্রায় ২৪ হাজার টাকা। এই নিলামে অংশ নেয় ছয়টি প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে একটি এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্সের, বাকি পাঁচটি নামমাত্র। একই বছরের ১০ ডিসেম্বর অপর একটি চালানের কায়িক পরীক্ষা করা হয়। যাতে ৬২৯টি একই ব্র্যান্ডের ফ্রিজ পাওয়া যায়। কান্ট্রি অব অরজিন চীন লেখা এসব পণ্য নিলামে সংরক্ষিত মূল্য প্রস্তাব করা হয় ২ কোটি ৫৪ হাজার ৭৯৬ টাকা। সে হিসেবে প্রতিটি ফ্রিজের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩২ হাজার টাকা। এই চালানেও এসকোয়ারের সেই প্রতিষ্ঠান চালানটি নিয়ে নেয়। ১৭ নভেম্বর এসকোয়ার হেবি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের একটি চালানের ১১টি কন্টেইনার কায়িক পরীক্ষা করা হয়। এতে ৮৬৬টি ফ্রিজ ও ২৬ হাজার ৮৫৩ কেজি ফ্রিজের যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়। যার কান্ট্রি অব অরজিন থাইল্যান্ড। নিলামে সংরক্ষিত মূল্য প্রস্তাব করা হয় এক কোটি ৩৬ লাখ ৮০ হাজার ৪৬৩ টাকা। নিলামে সেই একই প্রতিষ্ঠান, ভুয়া একটি প্রতিষ্ঠান ও তাদের একজন ব্যক্তি অংশ নেয়। পণ্য প্রায় একই প্রতিষ্ঠান।
জালিয়াতি করে জেনারেল ব্র্যান্ডের এসি ও যন্ত্রাংশ নিলাম থেকে নিয়েছে এসকোয়ার হেবি ইন্ডাস্ট্রিজ
সূত্র আরও জানায়, চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল এসকোয়ার হেবি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের একটি চালান কায়িক পরীক্ষা করা হয়। যাতে কান্ট্রি অব অরজিন থাইল্যান্ড লেখা ১ হাজার ২০০ পিস এসি, ১ হাজার ২০০ পিস এসির আউটডোর ক্যাসিং, প্রায় ৩৬৬২ কেজি প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল পাওয়া যায়। চালানটির সংরক্ষিত মূল্য প্রস্তাব করা হয় এক কোটি ৮৫ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬০ টাকা। এই পণ্য চালানের নিলামেও এসকোয়ারের সেই প্রতিষ্ঠান, একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও এসকোয়ারের এক ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন। এসকোয়ারের সেই প্রতিষ্ঠান পণ্যটি পায়। ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর অপর একটি চালান কায়িক পরীক্ষা করা হয়। যাতে কান্ট্রি অব অরজিন থাইল্যান্ডের ১ হাজার ৭২৪ পিস এসির ইনডোর কেসিং ও স্প্লিট পাওয়া যায়। ১ কোটি ৭০ লাখ ৯৫ হাজার ৫৪২ টাকা সংরক্ষিত মূল্য প্রস্তাব করা চালানটির নিলামে এসকোয়ারের সেই প্রতিষ্ঠান, দুইটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও এসকোয়ারের এক ব্যক্তি অংশ নেন। চালানটি পান একই প্রতিষ্ঠান। এসকোয়ার হেবি ইন্ডাস্ট্রিজের অপর একটি চালান ১২ ডিসেম্বর কায়িক পরীক্ষা করা হয়। তাতে ৭৩১২ কেজি ওজনের এসি ও এসির যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়। কান্ট্রি অব অরজিন থাইল্যান্ডের চালানটি ৬৮ লাখ ৪৬ হাজার ১০০ টাকা সংরক্ষিত মূল্য প্রস্তাব করা হয়। এই নিলামেও এসকোয়ারের একটি প্রতিষ্ঠান পান। তবে আরো তিনটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও এসকোয়ারের এক ব্যক্তি নিলামে অংশ নেন।
সার্প ব্র্যান্ডের ১০৮৯টি ওয়াশিং মেশিন একই জালিয়াতি করে আমদানি
সূত্রমতে, ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের একটি চালান কায়িক পরীক্ষা করা হয়। যাতে কান্ট্রি অব ইন্দোনেশিয়া লেখা ৮-১১ কেজি ধারণ ক্ষমতার ১ হাজার ৮৯টি সার্প ব্র্যান্ডের ওয়াশিং মেশিন পাওয়া যায়। নিলামে এসব ওয়াশিং মেশিনের ৩ কোটি ২৪ লাখ ৩ হাজার ১৬৯ টাকা সংরক্ষিত মূল্য প্রস্তাব করা হয়। সে হিসেবে প্রতিটির মূল্য দাঁড়ায় কম বেশি ২৯৫০০ টাকা। অথচ ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী দেশে সার্প ব্র্যান্ডের প্রতিটি ওয়াশিং মেশিনের মূল্য ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। এই নিলামেও এসকোয়ারের সেই প্রতিষ্ঠান চালানটি পান। তবে আরো তিনটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও এসকোয়ারের দুই ব্যক্তি অংশগ্রহণ করে। সার্প ব্র্যান্ডের ওয়াশিং মেশিনের অপর একটি চালানও একইভাবে এই প্রতিষ্ঠান বাগিয়ে নেয়। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়ালের একটি চালান কায়িক পরীক্ষা করা হয়। এতে থাইল্যান্ডের তৈরি ১৬ হাজার ১৫ কেজি পণ্যের সংরক্ষিত মূল্য ১ কোটি ৩৪ লাখ ৬৯ হাজার ৭২৭ টাকা প্রস্তাব করা হয়। চালানটিতে সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভুয়া একটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেন এবং চালানটি সেই প্রতিষ্ঠান পান।
একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাপানি ব্র্যান্ডের এসি, ফ্রিজ, ইলেকটনিক সামগ্রী ও যন্ত্রাংশ। অথচ উৎপাদনকারী দেশের তথ্য গোপন করে চীন থেকে আমদানি করছে এসকোয়ারের এই দুইটি প্রতিষ্ঠান। ব্র্যান্ড থাকলেও জালিয়াতি করে আমদানি হচ্ছে। এতে ডুপ্লিকেট ভার্সন বা রিকন্ডিশান পণ্য আমদানি করাও হতে পারে। আমদানি করার পর তা নিজেদের কারখানায় নিয়ে জাপানি ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগিয়ে বাজারজাত করা হতে পারে। এর ফলে একদিকে ক্রেতা ঠকছে। অন্যদিকে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসকোয়ারের জালিয়াতির বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে এসকোয়ার এর জনসংযোগ কর্মকর্তা মাইনুলের নাম্বারে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
** এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্স ও এসকোয়ার হেবি ইন্ডাস্ট্রিজের কায়িক পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখতে ক্লিক করুন
